আবদুর রশিদ, নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান):
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী করলিয়ামুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির (ম্যানেজিং কমিটি) সভাপতি পদে পরাজিত প্রার্থী মো. আবদুর রহিম বাবুলের বিরুদ্ধে। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। অভিযোগগুলোকে তারা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
সভাপতি পদে পরাজিত প্রার্থী আবদুর রহিম বাবুল বিদ্যালয়ের জমি জবরদখল, ‘পকেট কমিটি’ গঠন, উন্নয়ন তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ এবং শিক্ষার্থীদের টয়লেট ব্যবহারে বাধা দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান চলছে। শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক পরিবেশে ক্লাস করছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা বিদ্যালয়ে পড়ালেখা বা টয়লেট ব্যবহারে কোনো ধরনের সমস্যার কথা জানায়নি।
বিদ্যালয়ের জমি নিয়ে অভিযোগ
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫২ সালে কুমপাড়া এলাকায় করলিয়ামুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে বিদ্যালয়টি বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তরের সময় হাজী সুলতান আহমদ বিদ্যালয়ের দাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. সামশুল আলম দাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সামশুল আলম বর্তমানে অসুস্থ থাকায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার ছোট ভাই মো. আলম দাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিদ্যালয়ের জমি জবরদখলের অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের নামে থাকা প্রায় ১ একর ৫৩ শতাংশ জমি বর্তমানে বিদ্যালয়ের দখলেই রয়েছে। জমির কোনো অংশে স্থানীয় কারও জবরদখল রয়েছে—এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশের পরিবেশেও এ ধরনের কোনো বিরোধের দৃশ্যমান চিত্র পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য জায়গা দেওয়ার বিষয়েও দাতা সদস্য মো. আলম জানান, তৎকালীন সভাপতি শফি আলম ও প্রধান শিক্ষক মো. জাফর আলম হেলালী দাতা সদস্যের কাছে জায়গা চাওয়ার পর সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া ৩১৫ নম্বর খতিয়ান থেকেও বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
গত ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সভাপতি পদে পরাজিত প্রার্থী আবদুর রহিম বাবুল। তিনি নির্বাচিত কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে নির্বাচনের পর্যবেক্ষক মো. নুরুল ইসলাম ও মো. করিম উদ্দিন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গ্রহণে কোনো ধরনের কারচুপি হয়নি। নির্ধারিত সময়ে ভোট গ্রহণ শুরু ও শেষ হয় এবং ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
দাতা সদস্য মো. আলম বলেন, ‘আবদুর রহিম বাবুল আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করার জন্য অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি তাতে রাজি না হওয়ায় এখন আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। তার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়ের জমি দখল কিংবা কমিটি নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। নির্বাচনেও কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।’
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাফর আলম হেলালী বলেন, ‘বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই সভাপতি পদে পরাজিত আবদুর রহিম বাবুল ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন বলে আমরা মনে করছি।’
তিনি বলেন, ‘তিনি নিজেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। নির্বাচন শেষে নির্বাচিত কমিটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ তোলা কতটা যৌক্তিক, সেটি আমার বোধগম্য নয়। বিদ্যালয়ের জমি দখল, উন্নয়ন তহবিলের টাকা আত্মসাৎ কিংবা শিক্ষার্থীদের টয়লেট ব্যবহারে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরও কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।’
‘আমি অপপ্রচার করিনি, গঠনমূলক সমালোচনা করেছি’
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অপপ্রচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সভাপতি পদে পরাজিত প্রার্থী মো. আবদুর রহিম বাবুল।
তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলাম এবং নিজেই ভোট দিয়েছি। নির্বাচনে আমি তিনটি ভোট পেয়েছি, আর আমার নিকটতম প্রার্থী পেয়েছেন আট ভোট। ভোটে আমি হেরে গিয়েছি—এটা সত্য। তবে আমাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।’
বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নই। আমি কোনো অপপ্রচার করিনি; গঠনমূলক সমালোচনা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার যে বক্তব্য, সেগুলো তিনি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তুলে ধরেছেন।
অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়ার পরামর্শ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণসহ উপস্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা জরুরি।
তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রচার চালানোর কারণে বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রশাসনিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নির্বাচনে হেরে বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার
পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে
