জাহেদুল ইসলাম, লোহাগাড়া:
লোহাগাড়ায় নিখোঁজের সাত মাস পর এক পা হারানো অবস্থায় মো. রায়হান (১২) নামে এক শিশুর সন্ধান মিলেছে। শনিবার রাতে চুনতির ১৯ দিনব্যাপী সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল এলাকায় ভিক্ষা করার সময় স্বজনরা তাকে শনাক্ত করেন। দীর্ঘদিন পর সন্তানকে ফিরে পেলেও তার শারীরিক অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাবা।
রায়হান উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দিনের ছেলে। সে স্থানীয় একটি হেফজখানার শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবার ও রায়হানের ভাষ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে স্থানীয় একটি সেলুনে যাওয়ার পথে একটি গাড়িতে ওঠে সে। পরে গাড়িটি কক্সবাজারের দিকে গেলে রায়হান সেখানে চলে যায়। সেখানে সমুদ্রসৈকতে বডি ম্যাসাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত সে। পরে এক ব্যক্তি খাবার দেওয়ার কথা বলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যায়।
রায়হানের দাবি, ঢাকায় নেওয়ার পর কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছাকাছি একটি টিনের ঘেরা কক্ষে তাকে কথিত নানী সালমার কাছে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে আটকে রেখে ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হতো। ওই কক্ষে বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্রও দেখেছে বলে জানায় রায়হান।
তার ভাষ্য, ভিক্ষা করে আয় কম হওয়ায় দুই-তিন মাস পর এক রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তার একটি পা কেটে দেওয়া হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটি পা না থাকার বিষয়টি দেখতে পায় সে। পরে তাকে বলা হয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় তার পা কাটা গেছে। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলে তাকে আবার কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিক্ষা করতে নামিয়ে দেওয়া হয়।
রায়হান বলেন, আমাকে খাবার ও টাকা দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যায়। পরে ঢাকায় নিয়ে একটি জায়গায় আটকে রাখে। এরপর আমার পা কেটে দেয়। সুস্থ হওয়ার পর আমাকে ভিক্ষা করতে নামিয়ে দেয়।
প্রায় সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর শনিবার চুনতির সীরাত মাহফিল এলাকায় ভিক্ষা করার সময় রায়হানকে দেখতে পান তার স্বজনরা। পরে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, সাত মাস ধরে ছেলেকে কোথায় খুঁজিনি। অনেক জায়গায় খোঁজ করেছি। অবশেষে ছেলেকে পেলেও সুস্থ অবস্থায় পাইনি। যারা আমার ছেলের এ অবস্থা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে বিচার চাই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রায়হানকে আটকে রাখার সময় তার একটি কিডনি নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শিশুটির পেটে অস্ত্রোপচারের মতো চিহ্ন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে চিকিৎসা পরীক্ষা ছাড়া কিডনি অপসারণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয়রা জানান, সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর শিশুটিকে এক পা হারানো অবস্থায় ভিক্ষা করতে পাওয়া যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, তার অবস্থান এবং পা হারানোর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে দ্রুত তদন্তের দাবি জানান তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ নুরুচ্ছফা বলেন, ছেলেটির এমন অবস্থা দেখে আমরা মর্মাহত। সে কোথায় ছিল, কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল এবং কীভাবে তার পা হারাল—সবকিছু তদন্ত করে বের করা দরকার।
আইনজীবী নওশাদ আলী বলেন, শিশুটির বক্তব্যের পাশাপাশি তার নিখোঁজ হওয়ার তথ্য, পরিবারের করা জিডি বা মামলা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এবং তাকে কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিডনি অপসারণের অভিযোগ সত্য কি না, তা চিকিৎসা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, শিশু রায়হানকে উদ্ধারের পর তার বাবা থানায় এসেছিল ছেলে পা হারানোর বিচার চাইতে। ঘটনা যেহেতু ঢাকায় ঘটনাটি তাদেরকে সেখানে গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়া একটি শিশু কীভাবে এক পা হারিয়ে ভিক্ষারত অবস্থায় ফিরে এল—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন রায়হানের পরিবার ও স্থানীয়রা। পাশাপাশি তাকে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিল, পা হারানোর প্রকৃত কারণ কী এবং কিডনি অপসারণের অভিযোগের কোনো সত্যতা আছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে এলাকায়।
