মং এ খেন মংমং

২০২৬ সালের জুলাই মাসে কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনসহ মোট ৩২ জন জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তারা সবাই ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সরকার সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ (ধারা ৪৫) অনুযায়ী “জনস্বার্থে” এই সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এটি ছিল একটি বৃহৎ প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ, ব্যক্তিগত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে মো. কামাল হোসেন কিছু উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেন- ডি.সি. কলেজ, অরণ্যদয় এবং শেখ রাসেল শিশু হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠান স্থানীয় উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এসব উদ্যোগ অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু উন্নয়নের এই চিত্রের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে; সাংস্কৃতিক ন্যায়বিচার কোথায়?

কক্সবাজারে প্রচুর খাস জমি থাকা সত্ত্বেও, কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জন্য পৃথকভাবে কোনো জমি বরাদ্দ করেননি। বরং তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিদ্যমান ২ একর জমি থেকে ১ একর অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেন। এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা ও অস্তিত্বের ওপর সরাসরি চাপ।

আমি তখন কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমি তখন কেন্দ্রের জমি রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি। এক ইঞ্চি জমিও যেন কেড়ে নেওয়া না হয়, সেই লক্ষ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। একইভাবে, রামুতে অবস্থিত রাখাইন সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটকে বিজিবির দখল থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করি।

এই লড়াই কেবল জমি রক্ষার ছিল না; এটি ছিল সংস্কৃতি, পরিচয় ও ন্যায্য অধিকারের পক্ষে এক অবিচল অবস্থান। বিশেষ করে রাখাইনসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু অবকাঠামো নয়; এগুলো তাদের অস্তিত্ব, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের জীবন্ত প্রতীক।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কোনো ক্ষমতাই চূড়ান্ত নয়; যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, অন্যায় শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও সচেতন প্রতিরোধের কাছে পরাজিত হয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে সরকারি ভূমি দখল কিংবা সাংস্কৃতিক সম্পদ হরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নতুন প্রজন্মের জন্য এক অবিরাম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।


লেখক : ‌ ক‌বি, কলা‌মিস্ট ও কক্সবাজার সাংস্কৃ‌তিক কে‌ন্দ্রের সা‌বেক প‌রিচালক।