জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:

‘সর্ব রোগের দাওয়াই যেন প্যারাসিটামল’—এমন অভিযোগ উঠেছে টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত এনজিও হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে। রোগ যাই হোক, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অধিকাংশ রোগীকেই প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। কখনো কখনো ওআরএস বা স্যালাইনও দেওয়া হয় বলে তারা জানিয়েছেন।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয় রোগীদের। চিকিৎসক দেখানোর পর হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিতে গিয়ে অনেক রোগী হতাশ হয়ে ফিরছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত এনজিও হাসপাতালগুলোর প্রায় একই চিত্র বলে জানা গেছে।

রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর পর রোগের ধরন বিবেচনা না করেই অনেক রোগীকে প্যারাসিটামল দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ওষুধ সরবরাহ না করায় চিকিৎসাসেবা নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এনজিও হাসপাতালগুলোতে প্যারাসিটামলসহ নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের বলে দাবি স্থানীয়দের। পাশাপাশি মেডিকেল পরীক্ষার নামে ভুল বা বিতর্কিত মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনেকে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

তবে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মুচনী এলাকায় অবস্থিত ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত টিডিএইচ হাসপাতাল নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ও রোহিঙ্গা রোগীরা। তাদের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। আশপাশে বিকল্প চিকিৎসাকেন্দ্র কম থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকে সেখানে চিকিৎসা নিতে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেবার মান নিয়ে রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনেকে টিডিএইচ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ হাসপাতালটির সেবা নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। ভুল বা মনগড়া মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগসহ টিডিএইচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

টেকনাফের বিভিন্ন এনজিও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও স্থানীয় ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসা শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ না করায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এ কারণে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে রোহিঙ্গা রোগীর চাপও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের কয়েকজন বলেন, টিডিএইচের মতো এনজিও হাসপাতালে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট না করে স্থানীয় ফার্মেসি বা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াই ভালো। এতে সময় বাঁচার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সুযোগ থাকে।

টিডিএইচ হাসপাতালে প্যারাসিটামলনির্ভর চিকিৎসা এবং ভুল বা বিতর্কিত মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের মেডিকেল ডক্টর সুপারভাইজার ডা. ইশমাম কামালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সরাসরি টিডিএইচ হাসপাতালের অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি বদরুল ইসলাম ওরফে বজলু বলেন, “টিডিএইচ হাসপাতালে রোগীদের প্যারাসিটামল ছাড়া তেমন কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না।”

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) সিনিয়র সহসভাপতি সাংবাদিক নেতা শামসুল আলম শারেক বলেন, “টিডিএইচ হাসপাতালে শুধু প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগী বসিয়ে রেখে সব ধরনের রোগে প্যারাসিটামল দেওয়ার মাধ্যমে হাসপাতালটি স্থানীয় ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতারণা করছে।”

তিনি আরও বলেন, “টিডিএইচ হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।” হাসপাতালটির কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

সচেতন অভিভাবক ও হ্নীলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল আমিন চৌধুরী বলেন, “টিডিএইচ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে রোহিঙ্গাদের যেমন অভিযোগ রয়েছে, তেমনি স্থানীয়দেরও অভিযোগের শেষ নেই।”

রোগীদের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, “সারাদিন অপেক্ষায় রেখে বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়ার নামে দুই-তিন দিনের প্যারাসিটামল এবং বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজনকে নিম্নমানের কিছু ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।”

টিডিএইচের মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগের কারণে রোগী ও তাদের স্বজনরা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দাবি করে তিনি জনস্বার্থে হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

টিডিএইচ পরিচালিত মুচনী হাসপাতালের বিরুদ্ধে নিম্নমানের চিকিৎসাসেবা ও ভুল মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) আব্দুল হান্নানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জনস্বার্থে বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।

সম্প্রতি উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিউনিটি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ এনামুল হক বলেন, “টিডিএইচের দেওয়া মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা ভেঙে পড়লে বিষয়টি দুঃখজনক। এর ফলে অনেক সময় রোগীর বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

বিষয়টিতে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান, আগামী জেলা সমন্বয় সভায় টিডিএইচ হাসপাতালের বিষয়টি উত্থাপন করবেন।

চিকিৎসাসেবার নামে এনজিও হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে এনজিও পরিচালিত হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা নজরদারির আওতায় এনে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।