আবদুল হামিদ:
কক্সবাজার পৌরসভা খুব দ্রুত সিটি কর্পোরেশন হচ্ছে। সরকারের উচ্চ মহল থেকে আসা এমন ঘোষণা আমরা সবাই জানি। তবে অনেকে এ ঘোষনাকে শুভঙ্করের ফাঁকি মনে করছে। বিষয়টি নিয়ে আমি নিজেও বিজ্ঞ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি এবং জানার চেষ্টা করি। আমি মনে করি সরকারের এ ঘোষণায় আপাতত কোনো শুভঙ্কর নেই।
বাংলাদেশে সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে সর্বশেষ আইন বলতে রয়েছে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯। এ আইনটি জ্ঞাত হয়ে জানতে পারি বাংলাদেশের কোনো পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ক্ষেত্রে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-‘এ সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত যোগ্যতার কোনো মানদণ্ড উল্লেখ নেই। তবে এ সংক্রান্ত একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন চোখে পড়ে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি এ প্রজ্ঞাপনটি ইস্যু করে। এ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড পাওয়া যায় । উক্ত প্রজ্ঞাপনের ৪ নম্বর ধারায় সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার জন্য ৮টি অত্যাবশ্যকীয় শর্তের কথা বলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—বিদ্যমান কক্সবাজার পৌরসভা কি সিটি কর্পোরেশন হওয়ার জন্য এসব মানদণ্ড পূরণ করে?
সরকারের নির্ধারিত করে দেওয়া এসব শর্তগুলো বিশ্লেষণ করে দেখি কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী। চলুন দেখি সেসব শর্তসমূহ এবং এসব মানদণ্ড পূরণে কক্সবাজারের অপরিহার্য অনুষঙ্গসশুহ কী কী।
এক. জনসংখ্যা
প্রজ্ঞাপনের ৪(ক) ধারায় বলা হয়েছে—
“বিদ্যমান পৌরসভার জনসংখ্যা ন্যূনতম ৪ (চার) লক্ষ হইতে হইবে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভার স্থায়ী জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ। সে হিসাবে শুধু স্থায়ী জনসংখ্যার বিচারে কক্সবাজার পৌরসভা এই মানদণ্ড পূরণ করে না।
তবে কক্সবাজারের নগর বাস্তবতা বাংলাদেশের অন্যান্য সাধারণ পৌরসভার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন নগরী। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, পর্যটনকর্মী, মৌসুমি শ্রমিক ও অন্যান্য অস্থায়ী জনগোষ্ঠী শহরে অবস্থান করে। ফলে শহরের কার্যকর বা বাস্তব নগর-জনসংখ্যা স্থায়ী জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি।
এছাড়া সীমানা সম্প্রাসরণ করে ২-৩টি এলাকা যুক্ত করলে জনসংখ্যার মানদণ্ডটি সহজে পূরণ হয়ে যায়।
দুই. জনসংখ্যার ঘনত্ব
৪(খ) ধারায় বলা হয়েছে—
“জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ন্যূনতম ৩ (তিন) হাজার হইতে হইবে।”
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার পৌর এলাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৬ হাজার। অর্থাৎ নির্ধারিত ৩ হাজারের তুলনায় তা প্রায় দ্বিগুণ। সুতরাং বলতে পারি জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে কক্সবাজার পৌরসভা সিটি কর্পোরেশন গঠনের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে।
তিন. স্থানীয় আয়ের উৎস
৪(গ) ধারায় বলা হয়েছে—
“স্থানীয় আয়ের উৎস বার্ষিক ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) কোটি টাকা হইতে হইবে।”
আমি মনে করি, কক্সবাজারের ক্ষেত্রে এই শর্তটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা জানি কক্সবাজার শুধু একটি প্রশাসনিক শহর নয়। এটি বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন ও আতিথেয়তা-নির্ভর অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি।
স্থানীয় আয়-উৎসের দিক থেকে কক্সবাজারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী।
কক্সবাজার পৌর এলাকার প্রায় ৫০০ (পাঁচশত) হোটেল- মোটেল- রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট পর্যটনসেবা, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটি বড় স্থানীয় অর্থনীতি (বার্ষিক প্রায় ৯০০ কোটি টাকার) গড়ে উঠেছে।
এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে স্থানীয় সরকার বিভিন্ন ধরনের কর, ফি, লাইসেন্স, অনুমোদন, ইজারা ও অন্যান্য রাজস্ব পেয়ে থাকে। এছাড়া এ স্থানীয় উৎস থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বছরে অন্তত ৫০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পায়, যা ৫ কোটি টাকার ন্যূনতম মানদণ্ডের তুলনায় অন্তত ১০গুণ বেশি।
চার. শিল্প ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব
৪(ঘ) ধারায় বলা হয়েছে—
“প্রস্তাবিত এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকিতে হইবে এবং উহা বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হইতে হইবে।”
ঢাকা -চট্টগ্রামের মতো কক্সবাজারে প্রচলিত অর্থে ভারী কোনো শিল্প-কারখানা নেই। কক্সবাজারের অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত পর্যটন, মৎস্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং সেবা খাতনির্ভর।
আগেই বলেছি, কক্সবাজার শহর ও আশপাশে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনভিত্তিক সেবা নিয়ে একটি বড় সার্ভিস ও হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, বরফকল, শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং বিসিক শিল্পনগরীভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
অতএব বলা যায়, কক্সবাজারের শিল্প কাঠামোতে ভারী শিল্পের উপস্থিতি না থাকলেও এর বিদ্যমান শিল্প ও বাণিজ্যক গুরুত্ব রয়েছে অসীম।
পাঁচ . ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধা
৪(ঙ) ধারায় বলা হয়েছে—
“প্রস্তাবিত এলাকার ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধাদি থাকিতে হইবে যাহা ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা যাইবে।”
এই মানদণ্ডের ক্ষেত্রে কক্সবাজারের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। শহরে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সুবিধা , উন্নত সড়ক যোগাযোগ, ঢাকা -চট্টগ্রাম হয়ে সরাসরি রেল যোগাযোগ, আধুনিক রেলস্টেশন, পর্যটন অবকাঠামো এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান।
এখানে কক্সবাজারের উত্তরে খুরুশকুল -ভারুয়াখালী ও দক্ষিণের আশপাশের এলাকায় নগর সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বৃহত্তর কক্সবাজার অঞ্চলে শিল্প ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোরও দ্রুত বিকাশ ঘটছে। বিশেষ করে মহেশখালী-অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ কক্সবাজার অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নগর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ছয়. বিদ্যমান পৌরসভার বার্ষিক আয়
৪(চ) ধারায় বলা হয়েছে—
“বিদ্যমান পৌরসভার বার্ষিক আয় ন্যূনতম ১০ (দশ) কোটি টাকা হইতে হইবে।”
কক্সবাজার পৌরসভার হিসাব শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পৌরসভার বর্তমান বার্ষিক স্থানীয় রাজস্ব আয় প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত ১০ কোটি টাকার ন্যূনতম সীমার তুলনায় পৌরসভার রাজস্ব আয় প্রায় সাড়ে তিন গুণ।
এই রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—হোল্ডিং/গৃহকর, ট্রেড লাইসেন্স ফি, ইমারত নির্মাণ ও নকশা অনুমোদন ফি, বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড ফি, পৌরসভার নিজস্ব মার্কেট ও দোকানের ভাড়া, পৌর সম্পত্তির আয়, টার্মিনাল ইজারা, ঘাট ও হাট-বাজারের ইজারা, পানি সরবরাহের ফি এবং বিভিন্ন লাইসেন্স, সার্টিফিকেট, অনুমোদন ও সেবা ফি।
সুতরাং বিদ্যমান পৌরসভার বার্ষিক আয়ের মানদণ্ড কক্সবাজার পৌরসভা সুস্পষ্টভাবেই অতিক্রম করেছে।
সাত. স্থানীয় জনমত
৪(ছ) ধারায় বলা হয়েছে—
“প্রস্তাবিত এলাকায় সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্থানীয় জনমত অনুকূলে থাকিতে হইবে।”
কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার বিষয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ রয়েছে। পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারের দ্রুত পরিবর্তন, জনসংখ্যার চাপ, পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতির সম্প্রসারণ, নগর ব্যবস্থাপনার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে একটি শক্তিশালী নগর প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
তবে জনমতের বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য জেলা প্রশাসকের গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক গণশুনানি, মতামত জরিপ কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের লিখিত মতামত বা গণস্বাক্ষর গ্রহণ করা যেতে পারে।
আট. সিটি কর্পোরেশনের আয়তন
সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনের ৪(জ) ধারায় বলা হয়েছে—
“আয়তন ন্যূনতম ২৫ (পঁচিশ) বর্গ কিলোমিটার হইতে হইবে।”
কক্সবাজার পৌরসভার বর্তমান আয়তন প্রায় ৩৩ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশন হওয়ার জন্য নির্ধারিত ২৫ বর্গকিলোমিটারের চেয়ে বর্তমানেই আয়তন প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার বেশি।
সুতরাং দেখা যায় আয়তনের ক্ষেত্রেও কক্সবাজার পৌরসভা সিটি কর্পোরেশন গঠন হওয়ার জন্য ইতিমধ্যে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে।
প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত এ আটটি মানদণ্ডের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, কক্সবাজার পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা, অবকাঠামো, আয়, আয়তন, ঘনত্ব এবং নগর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা ইতোমধ্যে অর্জন করেছে।
এ বাস্তবতার মাপকাঠিতে জনসংখ্যার ন্যূনতম ৪ লাখের শর্তটি ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলো মানদণ্ড পূরণের পক্ষে কক্সবাজারের শক্তিশালী বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। বিদ্যমান পৌরসভা এলাকা সম্প্রসারণ করলে (যেমনটা প্রাথমিক আলোচনা হচ্ছ) এ শর্তটিও সহজে পূরণীয়।
শেষাংশে বলতে পারি, সীমানা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা থাকুক বা না থাকুক, কক্সবাজারের বর্তমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পর্যটননির্ভর নগরায়ণ, অবকাঠামোগত বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার দাবি নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব ও সময়োপযোগী দাবি।
আবদুল হামিদ
ব্যাংকার ও লেখক -গবেষক
