স্টাফ রিপোর্টার, পেকুয়া:
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ও নির্দিষ্ট পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় বিচ্ছিন্নভাবে মাদকসেবীদের আনাগোনা থাকলেও সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় মাদক ক্রেতা-বিক্রেতাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। মাদকের বিস্তারের পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই ও জুয়ার মতো অপরাধও বাড়ায় উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে শিলখালী ইউনিয়নের কসাইপাড়া, লম্বামোড়া ও জারুলবুনিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের কাছে মাদক কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কসাইপাড়া। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার কয়েকটি বাড়িকে ঘিরে দিন-রাত মাদকের আসর বসে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আসরে মাদক সেবনের পর একটি অংশ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কসাইপাড়া ও আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচার সঙ্গে কালু মিয়ার ছেলে সেলিম ও জসিম, সোনা মিয়ার ছেলে সেলিম (২), সিরাজের ছেলে চাদু মিয়া, দুলা মিয়ার ছেলে অলী আহমদ এবং রেহেনা, নাছিমা ও মমতাজ বেগমসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
এ ছাড়া শিলখালীর লম্বামোড়া এলাকার লাল মিয়ার জামাই আলমগীর, টুনু মিয়ার ছেলে আলমগীর, দুদু মিয়ার ছেলে মিজান এবং বদিউল আলমের ছেলে মাহামুদুল করিমের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
শিলখালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত রহমত আলীর ছেলে মো. পারভেজ মোশারফ ও জসিম উদ্দিনের ছেলে খোরশেদুল আলমের নামও মাদক ব্যবসার অভিযোগে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি চক্র পেকুয়ার পাশাপাশি বাঁশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এর আগে বাঁশখালী এলাকায় বিপুল পরিমাণ মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়ে কারাগারে ছিলেন।
তাদের পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এমনকি অভিযুক্তরা কারাগারে থাকার সময়ও সহযোগীদের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা চালু থাকার দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
শিলখালীর পাহাড়ঘেরা জারুলবুনিয়া এলাকাতেও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই এলাকার তারেক ওরফে বার্মাইয়্যা তারেক মাদক সরবরাহের একটি চক্র পরিচালনা করেন।
অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ি ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে আশপাশের এলাকায় মাদক সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মাদকের বিস্তার ঠেকানো না গেলে এর প্রভাব পড়ছে কিশোর ও তরুণদের ওপর। মাদককে কেন্দ্র করে অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।
মাদক সেবন ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক সেবনের ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় তরুণদের মধ্যে মাদকের প্রতি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রকাশ্যে এমন কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
শুধু মাদক নয়, শিলখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় জুয়া ও চুরির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবীদের একটি অংশ নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন করেছেন। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে এলাকাবাসী রাত-দিন পাহারাও বসিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মাদক ব্যবসার বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, মাদকসেবীদের পুনর্বাসন এবং চিহ্নিত স্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—শিলখালীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ থাকলেও এর পেছনে থাকা মূল হোতারা কারা এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
মাদক নির্মূলে শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের আটক নয়, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও অর্থের জোগানদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাদের মতে, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে শিলখালীকে মাদকের বিস্তার থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
এ বিষয়ে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, পেকুয়া উপজেলায় মাদক, চুরি ও জুয়ার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রতিটি ইউনিয়নে মাদকবিরোধী সমাবেশের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় এলাকাবাসী ও অভিভাবকেরা সচেতন হয়ে এগিয়ে এলে মাদকের বিস্তার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। মাদকসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য নির্ভয়ে পুলিশকে জানানোর জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
