সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আলীকদম :
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের গহিন পাহাড়ে অতিবৃষ্টির কারণে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে থেমে যায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার অন্যতম আশ্রয়স্থল সাকহ্লান পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হোস্টেলটি এখন ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর পথে।
নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত সাকহ্লান পাড়া স্কুলটি ২০২২–২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। গত ১২ থেকে ১৪ জুলাইয়ের অতিবৃষ্টিতে বিদ্যালয়টির ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবস্থাও।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী ও দুইজন শিক্ষক রয়েছেন। তবে বিদ্যালয় ভবন বিধ্বস্ত হওয়ায় বর্তমানে স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। হোস্টেলকেন্দ্রিক কিছু কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চলমান রয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে ভবনটি ভেঙে পড়ার ঘটনায় কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক আহত হননি।
বিদ্যালয়টি বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিষয়টি আলীকদম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. নূরুল ছাফার নজরে আসে। তিনি মুঠোফোনে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীকে অবহিত করেন। পরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় বান্দরবান জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিষয়টি আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের কাছে আসে। পরে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলমের তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বিদ্যালয় ও হোস্টেল পুনর্নির্মাণে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। গত ২৩ জুলাইয়ের দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যালয় ও হোস্টেলটি পাহাড়ি স্থাপত্যের আদলে নির্মাণ করা হবে। নতুন স্কুল ও হোস্টেল—দুটিতেই থাকবে তিনটি করে কক্ষ।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ বরাবরই নানা চ্যালেঞ্জের। এর ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। তবে দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগে পুনর্নির্মাণ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
আলীকদম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও কলেজ শিক্ষক মো. নূরুল ছাফা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করা। একটি স্কুল পুনর্নির্মাণ মানে শুধু একটি ভবন তৈরি নয়; এর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষার সুযোগ তৈরি করা। তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার ওপর ভর করেই সমানতালে এগিয়ে যাবে পাহাড় এবং বাংলাদেশ।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গর্ডেন ত্রিপুরা বলেন, ‘গত মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের সময় বিদ্যালয়টি ভেঙে পড়ে। এতে আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। এ উদ্যোগের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।’
পাড়া কারবারি দমলয় মুরুং বলেন, ‘এখানে আমরা চারটি গ্রামের মানুষ বসবাস করি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য এখানে আর কোনো স্কুল নেই। ২০২২–২৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই পাহাড়ে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের একমাত্র আশার জায়গা এই বিদ্যালয়। বৃষ্টিতে স্কুলটি ভেঙে যাওয়ায় আমরা খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এখন আবার স্কুলটি গড়ে উঠছে—এটি আমাদের জন্য শুধু একটি ভবন নয়, আমরা আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন ফিরে পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় বান্দরবান জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সার্বিক সহযোগিতায় দ্রুত বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।’
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম বলেন, ‘বিদ্যালয়টি অতিবৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কাজ চলমান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মতভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
স্থানীয়দের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি স্কুল শুধু একটি ভবন নয়—এটি প্রত্যন্ত জনপদের শিশুদের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি স্বপ্ন। অতিবৃষ্টিতে সেই স্বপ্নের অবকাঠামো ভেঙে পড়লেও দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
তাদের প্রত্যাশা, নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে এবং দ্রুত স্কুলের শ্রেণি কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে। এতে দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে সাকহ্লান পাড়ার অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে আগামী আগস্টের শেষ নাগাদ পুনর্নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজ শেষ হলে পাহাড়ের ঢালে আবারও মুখর হবে শিক্ষার্থীদের কোলাহল—ফিরে আসবে গহিন পাহাড়ের সেই শিক্ষার আলো।
