সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আলীকদম;

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় বর্ষা এলেই পাহাড়ের মাটি ভেদ করে বেরিয়ে আসে বাঁশের কচি অঙ্কুর, যা স্থানীয়ভাবে বাঁশ কোড়ল নামে পরিচিত। একসময় এটি শুধু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে বাঙালিদের কাছেও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সবজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে এর বাজারমূল্যও। তবে অতিরিক্ত আহরণের কারণে ভবিষ্যতে পার্বত্যাঞ্চলের বাঁশসম্পদ হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

মারমা সম্প্রদায়ের কাছে বাঁশ কোড়ল পরিচিত ‘মেহ্যাং’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘মেওয়া’, চাকমাদের ভাষায় ‘বাচ্ছুরি’ এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় ‘বাচ্ছুই’ নামে। মূলত বাঁশের গোড়ার কচি ও নরম অংশই বাঁশ কোড়ল নামে পরিচিত।

জানা গেছে, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাঁশ কোড়লের ভরা মৌসুম। বর্ষার শুরুতে বৃষ্টিতে মাটি নরম হলে মুলি, ডলু, মিতিঙ্গা, ফারুয়া, বাজ্জে ও কালিছুরিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশের কোড়ল গজাতে শুরু করে। মাটি থেকে চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি বের হলেই সেগুলো সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করা হয়। স্বাদের দিক থেকে মুলি বাঁশের কোড়ল সবচেয়ে জনপ্রিয় হওয়ায় এর চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি।

বর্ষা মৌসুমে আলীকদমের বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন সকাল-বিকেল স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ বাঁশ কোড়ল বিক্রি করেন। প্রতি কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও চাহিদা অনুযায়ী দাম ওঠানামা করে। বর্তমানে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও বাঁশ কোড়ল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদ পরিবেশন করা হচ্ছে। ফলে আলীকদমে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও এটি একটি বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

পানবাজার এলাকার বিক্রেতা রত্না তঞ্চঙ্গ্যা ও প্রভাতী তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রতি সোমবারের হাটে তারা ১০০ থেকে ১৫০ আঁটি বাঁশ কোড়ল নিয়ে আসেন। প্রতি আঁটি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। এ আয় দিয়েই তারা চাল, ডালসহ সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটান।

চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের রেফারপাড়া বাজারের বিক্রেতা উওয়াংচিং মারমা বলেন, “সারাদিন পাহাড়ে ঘুরে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করি। পরে বাজারে বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাই।”

স্থানীয়দের মতে, পার্বত্যাঞ্চলে ডলু, কাতি, মিতিঙ্গা, মুলি, কালী ও ছোটিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান বাঁশ জন্মে। কিন্তু অতিরিক্ত কোড়ল সংগ্রহ, বন উজাড়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক নানা কারণে বাঁশের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে পার্বত্যাঞ্চলে বাঁশে ফুল আসার পর ব্যাপক মড়ক দেখা দেয়। একই সময়ে ইঁদুরের আক্রমণেও অনেক বাঁশবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে বাঁশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যদিও পরে নতুন করে বাঁশ জন্মাতে শুরু করেছে, তবুও আগের অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় গৃহিণীরা জানান, বাঁশ কোড়ল দিয়ে মাংস, স্যুপ, মুন্ডি ও ভাজিসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার রান্না করা হয়। তাই বর্ষা মৌসুমে এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।

পরিবেশ সচেতনদের মতে, পরিকল্পিতভাবে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ এবং সরকারি উদ্যোগে বাঁশবন সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যতে পার্বত্যাঞ্চল থেকে মূল্যবান বাঁশের বিভিন্ন প্রজাতির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এই খাদ্যও হারিয়ে যেতে পারে।