বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃত্যুতে তিনদিনের শোক কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে দেশ। নতুন বছর, সামনে জাতীয় নির্বাচন। সব মিলিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান পদে এবার পূর্ণাঙ্গরূপে অধিষ্ঠিত হতে তারেক রহমানকে পরামর্শও দিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণীয় ফোরাম-জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠদের তথ্য, তিনি এখনও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেই কাজ করতে আগ্রহী। পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তিনি সরাসরি তৃণমূলের মতামতের পর গ্রহণ করতে চান বলে একটি সম্ভাবনা রয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামতের পর তারেক রহমান তা এখনই কার্যকর না করার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার জন্য মত দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে পারবো না।’’

প্রথম আলো বন্ধুসভা কক্সবাজার জেলা কমিটি ঘোষণা

সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটক তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে আটক-২

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, স্থায়ী কমিটির নেতারা ইতোমধ্যে তারেক রহমানকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান করে রেজ্যুলেশন করার পক্ষে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তা বারণ করেছেন। তিনি তার মায়ের শোকের বিষয়ে সতর্ক।

আরেক সদস্যের মন্তব্য, ‘‘তারেক রহমান চেয়ারম্যান, এটা স্থায়ী কমিটিতে অটো হয়ে যাবে। এরজন্য আবার কাউন্সিলের প্রয়োজন কেন হবে। গঠনতন্ত্রে কোনও বাধা নেই। এটা জরুরিভাবে— সে কারণে আমাদের মতামত আমরা কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাস করবো।’’

তারেক রহমানকে পর্যবেক্ষণ করেন এমন নেতা ও দায়িত্বশীলরা বলছেন, তারেক রহমান মূলত চাইছেন তৃণমূলের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হতে।

তারেক রহমানের আগে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা রাখেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। সেই থেকে মৃত্যু অবধি তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকের শুরু থেকে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। ওই আন্দোলনেই মায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন তারেক রহমান।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সূত্র জানায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমান তার মায়ের সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে যোগ দেন এবং ১৯৮৮ সালে দলের গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালান। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে তিনি একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন— যেখানে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। বগুড়ায় সফল সম্মেলনের পর তিনি অন্যান্য জেলা ইউনিটকে গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেন।

২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে তারেক রহমানকে। ২০০৫ সালে তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি গ্রেফতার হন এবং বিদেশে চিকিৎসা নিতে নির্বাসিত হন। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন। এর আগে তিনি ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ সালে, যখন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দি হন, তখন তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত করা হয়। তখন থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুগপৎ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, গঠনতন্ত্রে কোনও বিধি নিষেধ না থাকায় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করতে মত দিয়েছেন। যদিও তিনি নিজে এখনই এই প্রস্তাবে কোনও সায় দেননি।

গঠনতন্ত্রের ৭ এর ‘গ’ উপধারার ২ নম্বরে এ বলা আছে, ‘‘চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে চেয়ারম্যানের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।’’

‘গ’ উপধারার নম্বর ৩-এ বলা হয়েছে, ‘‘যেকোনও কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যানের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।’’

বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোনদিন চেয়ারম্যান হবেন, ওইটা দলীয় সিদ্ধান্তের পর জানতে পারবো।’’