এডভোকেট ইউসুফ আরমান

আধুনিক উৎপাদনশীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের ব্যাংকিং খাত। আর এই খাতের পুরো শৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে থাকে ঋণদাতা (ব্যাংক) এবং ঋণ গ্রহীতার পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ওপর।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এই চিরন্তন সম্পর্কে এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত ফাটল দেখা দিয়েছে। ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যকার স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেন এখন আর কেবল বাণিজ্যিক দেনা-পাওনায় সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের এক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল আইনি দ্বন্দ্বে। যার সবচেয়ে উদ্বেগজনক বহিঃপ্রকাশ ঘটছে দেশের আদালতগুলোতে জমে থাকা পাহাড়সম চেকের মামলায়।

তাত্ত্বিকভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হয় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা শিল্পায়নের চাকা সচল রাখার জন্য। কিন্তু বাস্তবতার জমিনে চিত্রটি বেশ ভিন্ন। ঋণ মঞ্জুরের সময় ব্যাংকগুলো এক প্রকার অলিখিত নিয়ম হিসেবে গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম বা ব্লাঙ্ক চেক (Blank Cheque) জামানত হিসেবে জমা রাখে। কোনো কারণে ঋণ গ্রহীতা খেলাপি হলে, ব্যাংক সেই চেকে মোটা অঙ্কের অর্থ বসিয়ে তা ব্যাংকে উপস্থাপন করে এবং ‘ডিজঅনার’ বা প্রত্যাখ্যাত করিয়ে আইনি পথে হাঁটে। দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act)-এর ১৩৮ ধারার অধিনে দায়ের হওয়া এই মামলা গুলোই এখন আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর বিশাল এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে অলিখিত চেকের এই যথেষ্ট অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আমাদের আইনি সুরক্ষা ও আসামির অধিকারের বিষয়টিও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ৪৩ ধারা স্পষ্ট বলছে— কোনো বিনিময় মূল্যবিহীন বা প্রতিদানহীন চেকে কোনো আইনি দায়বদ্ধতা কার্যকর হয় না

ব্যাংক যদি কোনো বৈধ বাণিজ্যিক প্রতিদান বা প্রকৃত দায়ের বাইরে গিয়ে সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার করে অবাস্তব অঙ্কের মামলা দায়ের করে, তবে আসামির খালাস পাওয়ার পূর্ণ আইনি সুযোগ রয়েছে। একইভাবে চেক যদি চুরি বা হারিয়ে যায়, তবে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির (যেমন: ২৩ এলআর ৩১) অনুযায়ী তার জন্য চেকে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তি দায়ী নন। তাছাড়া, চেকের মামলায় বাদীর আর্থিক সামর্থ্য এবং স্বচ্ছতা প্রমাণ করাটাও একটি অন্যতম আইনি শর্ত

কিন্তু আইনি সুরক্ষার এই মারপ্যাঁচের চেয়েও বড় সংকট তৈরি হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। ব্যাংক যখন অলিখিত চেককে একটি তাৎক্ষণিক ‘চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেয়, তখন অনেক সময় সৎ ও প্রকৃত সংকটগ্রস্ত ব্যবসায়ীরাও কোণঠাসা হয়ে পড়েন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট বা লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে যারা সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না, চেকের মামলার কারণে তাদের ব্যবসায়িক সুনাম ও ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা ধুলোয় মিশে যায়। নতুন করে অর্থায়নের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সচল প্রতিষ্ঠান গুলোও দেউলিয়া হওয়ার দিকে ধাবিত হয়। এতে ব্যাংক যেমন তার টাকা ফেরত পাওয়ার স্থায়ী পথ হারায়, তেমনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক ক্ষত গভীর হয়।

এই আইনি দ্বন্দ্বের ফলে বাজারে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রেডিট ক্রাঞ্চ’ বলা হয়। অন্যদিকে, হাজার হাজার চেকের মামলার কারণে মূল ধারার বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি থমকে গেছে। সচল কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান যেমন কমছে, তেমনি জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের ব্যাংকিং ও বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোকে কেবল সিকিউরিটি চেক বা জামানতের মোহে ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে; বরং ঋণ দেওয়ার আগেই গ্রাহকের ব্যবসার সম্ভাব্যতা (Feasibility Study) কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। একই সাথে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি (Willful Defaulter) এবং পরিস্থিতির শিকার হওয়া সৎ উদ্যোক্তাদের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। যারা নিয়মতান্ত্রিক সংকটের কারণে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাদের ঋণ পুনর্গঠন বা সহজ শর্তে ডাউনপেমেন্টের মাধ্যমে ব্যবসায় ফেরার সুযোগ দেওয়া উচিত।

ঋণদাতা ও ঋণ গ্রহীতার সম্পর্কটি হওয়া উচিত পরিপূরক,প্রতিপক্ষ নয়। চেকের মামলা কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে না, এটি বড়জোর সাময়িক উপশম মাত্র। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল ও টেকসই রাখতে হলে ব্লাঙ্ক চেকের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহিতা আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

(লেখক: জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী এবং আইন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক)