নিউ ইয়র্কের সেই হলঘরটি বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ নয়। ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে এই হলেই বাংলাদেশ কখনো তার দারিদ্র্যের কথা বলেছে, কখনো উন্নয়নের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে, কখনো জলবায়ু ঝুঁকির কথা তুলেছে, কখনো রোহিঙ্গাদের দুর্দশা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। এবার সেই একই মঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতির মাত্রাটিই যেন বদলে গেছে। বিশ্ব নেতারা যখন একে একে বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন সভাপতির আসনে একজন বাংলাদেশি ড. খলিলুর রহমান। আর সামনের সারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ দৃশ্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য যেমন আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক তাৎপর্যও। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া নিছক আনুষ্ঠানিক কোনো ঘটনা নয়। ২ জুনের নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকুরিসকে ৯৯-৯১ ভোটে পরাজিত করে এই পদে নির্বাচিত হন। এ পদে সভাপতির দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৮ সেপ্টেম্বর। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য ফলপ্রসূ একটি জাতিসংঘ’।
বাংলাদেশের জন্য এর মধ্যে একটি দীর্ঘ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আছে। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়েছিলেন। জাতিসংঘের সরকারি নথি বলছে, তিনিই ছিলেন ওই অধিবেশনের সভাপতি এবং সে সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। চার দশক পর সেই একই প্রতিষ্ঠানের সভাপতির আসনে আরেক বাংলাদেশি। আরও তাৎপর্যের বিষয়, ড. খলিলুর রহমান তখন চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করা একজন তরুণ কর্মকর্তা ছিলেন। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি পদে বাংলাদেশির ফিরে আসা নয়; এক অর্থে একই মঞ্চে একটি কূটনৈতিক প্রজন্মের স্মৃতিও ফিরে আসা।
ড. খলিলুর রহমানের জন্য দায়িত্বটি অবশ্যই বড়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো দেশের প্রতিনিধি হিসেবে সভা পরিচালনা করেন না; তাঁকে ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সভা পরিচালনা করতে হয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাজের মধ্যে রয়েছে অধিবেশন পরিচালনা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি এবং সাধারণ পরিষদের কাজ এগিয়ে নেওয়া। খলিলুর রহমান নিজেও নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছিলেন, তিনি ‘সবার সভাপতি’ হিসেবে কাজ করতে চান এবং মতপার্থক্য উপেক্ষা না করেই অভিন্ন জায়গা খুঁজতে চান।
এবারের অধিবেশনের বাস্তবতাও কঠিন। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণের চাপ, উন্নয়ন ঘাটতি, প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট, সব মিলিয়ে জাতিসংঘ নিজেই এক ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই ‘আস্থা পুনরুদ্ধার’ কথাটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বর্তমান বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রশ্ন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও অধিবেশন শুরুর সময় খলিলুর রহমানের সংলাপ, ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন।
এই বৃহৎ মঞ্চে বাংলাদেশের আরেকটি উপস্থিতি এবার বিশেষভাবে দৃশ্যমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের বক্তব্য দেবেন। ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং ২৮ সেপ্টেম্বর আবার চলবে; সভাপতির আসনে থেকে পুরো বিতর্ক পরিচালনা করবেন ড. খলিলুর রহমান।
তারেক রহমানের ভাষণকে তাই শুধু একটি রাষ্ট্রীয় ভাষণ হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এটি জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের জাতিসংঘে উপস্থিতি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে ৪৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথম বক্তব্য দেন। পরে জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমেও তিনি বক্তব্য রেখেছেন। এখন একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের একজন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে সেই মঞ্চে দাঁড়াচ্ছেন।
তবে এখানে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানকে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের মঞ্চ কোনো রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার যাচাইয়ের জায়গা নয়। সেখানে একজন প্রধানমন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করতে হয় রাষ্ট্রকে, একটি পরিবারকে নয়। ফলে তারেক রহমানের ভাষণের তাৎপর্য নির্ভর করবে তিনি কীভাবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক প্রশ্নগুলোকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেন তার ওপর। প্রথম ভাষণ হওয়ায় প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় বাংলা। জাতিসংঘের ছয়টি সরকারি ভাষার তালিকায় বাংলা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানেরা বহু বছর ধরে এই বিশ্বমঞ্চে বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার ঐতিহ্য বহন করে আসছেন, সঙ্গে থাকে তাৎক্ষণিক অনুবাদের ব্যবস্থা। ফলে বাংলা এখানে শুধু ভাষা নয়; রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
বাংলাদেশের জাতিসংঘ-যাত্রায় এই ভাষার উপস্থিতির সঙ্গে দেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের বিবর্তনও জড়িয়ে আছে। একসময় বাংলাদেশকে দেখা হতো মূলত দরিদ্র, দুর্যোগপ্রবণ, উন্নয়ন-সহায়তানির্ভর দেশ হিসেবে। এখন সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শান্তিরক্ষা, জলবায়ু কূটনীতি, তৈরি পোশাক, অভিবাসী শ্রম, উন্নয়ন অভিজ্ঞতা এবং রোহিঙ্গা সংকট। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন শুধু সহায়তা চাওয়া দেশ নয়; অনেক আন্তর্জাতিক আলোচনায় তার নিজেরও বলার মতো অভিজ্ঞতা আছে।
এই জায়গায় এসে মনে পড়ে আরেক বাংলাদেশিকে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান নন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর সঙ্গে যুক্ত। ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান দারিদ্র্য বিমোচনে তৃণমূলভিত্তিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের জন্য।
জাতিসংঘের মঞ্চেও ইউনূসের উপস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছিল দৃশ্যমান। ২০২৪ সালে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ৭৯তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় বক্তব্য দেন। ২০২৫ সালেও তিনি ৮০তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির উদ্যোগে সামাজিক ব্যবসা, যুব ও প্রযুক্তি নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ড. খলিলুর রহমান সেখানে তাঁর ‘থ্রি জিরোস’ ধারণা শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদ-ঘনত্বের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক শূন্য বেকারত্ব এর কথা তুলে ধরেন।
অর্থাৎ নিউ ইয়র্কে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গল্পটি একমাত্রিক নয়। একই আন্তর্জাতিক পরিসরে রয়েছে একজন বাংলাদেশি সাধারণ পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, একজন নোবেল বিজয়ীর আন্তর্জাতিক ধারণা এবং দেশের দীর্ঘ কূটনৈতিক ইতিহাস। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু, রোহিঙ্গা ও উন্নয়ন প্রশ্নে বাংলাদেশের সক্রিয়তা।
বিশেষ করে জলবায়ুর প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সভাপতির উদ্যোগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। নিম্নভূমি ও বদ্বীপভিত্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যের অংশ নয়; এটি উন্নয়ন, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
রোহিঙ্গা প্রশ্নও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম বড় পরীক্ষা। গত কয়েক বছরে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেমন এই সংকটকে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারে রাখার চেষ্টা করেছে, তেমনি বর্তমান পর্বেও বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন বিশ্বের মনোযোগকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নেওয়া যায়।
সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এবার যে ‘বাংলাদেশ’ দৃশ্যমান, সেটি কেবল পতাকা ও আসনের বাংলাদেশ নয়। এটি ইতিহাসের বাংলাদেশ, কূটনীতির বাংলাদেশ, বাংলায় কথা বলা বাংলাদেশ এবং পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়া বাংলাদেশ।
তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃশ্যমানতা নিজেই সাফল্যের শেষ কথা নয়। একজন বাংলাদেশি সভাপতির হাতে জাতিসংঘের অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্ব এসেছে, এটি মর্যাদার। প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেবেন, এটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল বিজয়ী একজন বাংলাদেশির ধারণা এখনো আন্তর্জাতিক আলোচনায় জায়গা পাচ্ছে, এটিও বাস্তবতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থাকবে আরও কঠিন: এই উপস্থিতি কতটা কার্যকর ফল তৈরি করতে পারে?
জাতিসংঘে বাংলাদেশের কণ্ঠ যত জোরালো হবে, প্রত্যাশাও তত বাড়বে। বিশ্বনেতাদের মুখে মুখে বাংলাদেশ যদি নতুন করে উচ্চারিত হয়, তবে সেই বাংলাদেশকে হতে হবে এমন এক দেশ, যে শুধু নিজের কথা বলে না, অন্যের কথাও শোনে; শুধু দাবি তোলে না, সমাধানের অংশও হয়; শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত থাকে না, সেই মঞ্চের সিদ্ধান্ত ও সমঝোতার প্রক্রিয়াতেও অর্থবহ অবদান রাখে।
নিউ ইয়র্কের মঞ্চে তাই এবার বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু ‘কে কোথায় বসেছেন’ তা নয়। বড় অর্জন হবে, বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে যদি একটি দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং বাস্তববাদী রাষ্ট্রের ছবিটিও বিশ্বমানসে স্পষ্ট হয়।
চার দশক আগে যে তরুণ কর্মকর্তা জাতিসংঘের করিডরে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন, আজ তিনি সেই সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে। পাশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আর আন্তর্জাতিক আলোচনার আরেক প্রান্তে উপস্থিত বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তিনটি সময় যেন একই নিউ ইয়র্কে এসে মিলেছে।
এ কারণেই এবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থিতি শুধু একটি সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় কতটা বদলেছে, আর সামনে সেই পরিচয়কে কতটা দায়িত্বের সঙ্গে বহন করা যাবে, তারও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com
