ইমাম খাইর:
ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ১৬ দিন কারাবন্দি। পাঁচ বছর আদালতের বারান্দায় দৌঁড়াদৌঁড়ি। অবশেষে মানসিক যন্ত্রণার অব্যাহতি। আলহামদুলিল্লাহ।

আমার কারাবরণ, কারামুক্তির কয়েকদিন এবং পরবর্তী পাঁচটি বছরে বিশাল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে। মুখোশধারী আর প্রকৃত মানুষ চিনে গেছি। পথ চলায় সতর্ক হয়েছি।

আমার নিয়োজিত আইনজীবী, জেলা বারের সভাপতি শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ আবদুল মন্নানের প্রতি কৃতজ্ঞতা। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি আমার পক্ষে বলিষ্ঠভাবে লড়েছেন। বড় ভাইয়ের ভূমিকা রেখেছেন।
প্রিয় মন্নান ভাইসহ যারা আমার জন্য সময়; শ্রম, মেধা দিয়েছেন, আমার দুঃসময় পরিবারকে সাহস জুগিয়েছিলেন, সবার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ।

১০/১১/২০২১ বিভীষিকাময় রজনী:
জেলা শ্রমিক লীগের তৎকালীন সভাপতি জহির সিকদার হ’ত্যার ঘটনায় আসামি ধ’রার নামে র‍্যাবের তৎকালীন অধিনায়ক খাইরুল ইসলাম আইনের পোশাক পরে যে অপরাধ করেছেন তা ক্ষমার অযোগ্য। আমি আজাহারভুক্ত আসামি না হলেও আমার সঙ্গে আইন বহির্ভূত আচরণ করেছেন। ওই দিন তিনি সত্য ও বাস্তবতা বুঝতে চাননি। আমার আকুতি, মিনতি শুনেননি। রাতভর টর্চারসেলে আটকে রাখেন। স্বৈরাচারের দালাল/দোসরদের ইশারায় আমার উপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বাথরুমের কমেটযুক্ত দুই হাত বিশিষ্ট একটি কক্ষে আটকে রাখে সারারাত। দুঃসহ যাতনা। দুর্গন্ধে প্রাণ যায় যায় অবস্থা।
আন্ডারওয়ার ছাড়া শরীরের সব কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে। গায়ের ঘাম আর চোখের পানিতে দাফনের গোসল করি! মৃ’ত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি। ওই বিভীষিকাময় রাতের প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি বছর!

ঘরে রেখে যাওয়া অসুস্থ সন্তানের চেহারা মনে পড়ছিল বারবার। অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। অন্ধকার টর্চারসেলে মনে পড়ছিল এই পৃথিবীর আপনজনদের।
আমি কেন বন্দি? নিজের অপরাধ খুঁজতে গিয়ে বারবার বেহুশ। নিঃশ্বাসে কান্না আর কান্না। ফরিয়াদ করেছি মহান মনিবের দরবারে। মনোবল ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। মিথ্যা অভিযোগমুক্ত হব, আমি নিশ্চিত ছিলাম।

প্রেসার বেড়ে কাহিল:
টেনশনে ডায়াবেটিস আর প্রেসার বেড়ে কাহিল অবস্থা। টর্চারসেলে একাকী বন্দী। গভীর রজনী। প্রচুর ভয় পাচ্ছিলাম। অন্ধকারে কান্নার বিকট শব্দে হঠাৎ ছুটে আসে একজন লোক। প্রেসার, পালস মেপে দেখল। দ্রুত নিচে গিয়ে কাকে যেন রিপোর্ট করলো! পরক্ষণে তালা খুলে চোখ-হাত বেঁধে নিচে নিয়ে গেল আমাকে। সেখানে কিছুক্ষণ পরে কয়েকজন অফিসার আসলো। তাদের সামনে বসালো। জেরা আর জেরা। যেন আমি মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি/কিলার!
তারপর আমাকে নিয়ে শুটিং করলো। ছবি তুলল। থানায় হস্তান্তরের আগে ছবিগুলো দালাল সাংবাদিকদের নিকট পাঠিয়ে দিল। মিডিয়া গ্রুপে পোস্ট করল। নেট দুনিয়ায় প্রচার করল। তাতে কী হয়েছে? র‍্যাবের পেজে কমেন্ট বক্সে গিয়ে উল্টো বাঁশ দিল সবাই, যা কারামুক্ত হওয়ার পরে দেখেছি।

গভীর রাতে বাসায় র‍্যাব:
কোন সুনির্দিষ্ট মামলায় আমি গ্রেফতার হইনি। ৯ নভেম্বর গভীর রাতে আমার বাসায় হানা দেয় র‍্যাবের একটি টিম। তাদের চিল্লাচিল্লা আর দরজা ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙ্গে আমার স্ত্রী ও অসুস্থ সন্তানের। বাসায় ঢুকে ন্যাক্কারজনক কান্ড ঘটায়। পোশাক আর অ’স্ত্র দেখে আ’তঙ্কগ্রস্থ আমার অবুঝ দুই শিশু সন্তান।
মধ্যরাতে পুরো বিল্ডিং ও পাড়া খবর করে যায় তারা।

১০ জন সাংবাদিককে নাজেহাল:
কোন মামলা কিংবা অভিযোগ ছাড়া একজন সংবাদকর্মীর বাসায় রাতের আধারে কেন র‍্যাব যাবে? এই প্রশ্ন থেকে পরের দিন বিকেলের শিডিউলে সিও খাইরুলের সাক্ষাতে গিয়েছিলেন প্রেসক্লাবের শ্রদ্ধেয় সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারীর নেতৃত্বে সিনিয়র ১০ জন সাংবাদিক। তারা আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। সে কারণে হয়তো খায়রুলের মাস্টার প্ল্যান ভঙ্গ হয়েছে। তাই ক্ষেপে গেলেন। সাংবাদিকদের রাতভর বসিয়ে রাখলেন। চোর-ডাকাতের মত নাজেহাল করেন। সবাইকে হ্যান্ডকাফ পরাতে চাইলেন। চরম গাদ্দারি দেখালেন খাইরুল। আরো কত্তো কাহিনী! এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সরি, আমার দুঃসময়ের সহকর্মীরা। সবার প্রতি আজীবন ঋণী হয়ে রইলাম। অশেষ কৃতজ্ঞতা।

১১ নভেম্বর সারারাত থানার সেলে। সেখান থেকে কারাগারে। ১২ নভেম্বর থেকে ২৮ পর্যন্ত বন্দী জীবন কাটালাম। এই ১৬দিন কেউ আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? যারা আমার মা-বাবাকে কাঁদালেন; স্ত্রী-সন্তানদের ঘুম হারাম করলেন, আত্মীয়স্বজনকে টেনশনে রাখলেন, তাদের বিবেককে প্রশ্ন রেখে গেলাম। আমি মজলুম। আপনি/আপনারা জালেম। মজলুমের সঙ্গে আল্লাহ আছেন।

পত্রিকায় মিথ্যা গল্প রচনা:
সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা কলম ধরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করি। কিন্তু মিথ্যা গল্প রচনা সাংবাদিকতায় পড়েনা।
আমাকে গ্রেফতারের পর স্থানীয় একটি শীর্ষ পত্রিকায় লিখেছে, ঘটনার সময় নাকি আমি লিংক রোডে ছিলাম! আমি ‘শুট’ বলার সাথে সাথে নাকি গু’লি করেছে! কি জঘন্য মিথ্যাচার। আল্লাহর কসম, ঘটনার ৫/৬ মাসের মধ্যে লিংক রোড এলাকায় গিয়েছি কিনা সন্দেহ। আলোচিত একটি খু’নের ঘটনায় আমাকে ফাঁসিয়ে কাকে বাঁচাতে এই মিশনে নেমেছিলে? সংবাদকে পুঁজি করে কিলারচক্র থেকে কত টাকা হাতিয়ে নিয়েছো? একইভাবে র‍্যাবের ফরমায়েশি প্রেস রিলিজ ছেপেছে কক্সবাজারের অনেক পত্রিকা। যদিওবা ‘চাপে পড়ে’, ‘বাধ্য হয়ে’ ছেপেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ওই সময় কোন সাংবাদিক কিংবা সাংবাদিক সংগঠন বিবৃতি দিতেও সাহস পায়নি। উল্টো র‍্যাবের পাচাটা, দালালি করেছে কিছু সাংবাদিক।

আমাকে কারাগারে পাঠিয়ে পরের দিন পত্রিকার পাতায় কেমনে মিথ্যা রচনা ছাপাতে পারলে? নিরপরাধ একজন মানুষকে ‘কিলার’ বানাতে বিবেকে বাধেনি? তোরাই তো সাংবাদিকতার ক’লঙ্ক। জা’নোয়ারের প্রজন্ম।
আমার সাংবাদিকতার প্রায় দুই যুগ। জ্ঞাতবশত সংবাদে কারো ক্ষতি করিনি।

আমাকে কেন খুঁজলো র‍্যাব?
২০২১ সালের ৫ নভেম্বর লিংকরোডে অ’স্ত্রধারী স’ন্ত্রাসীদের হাতে নিহ’ত হন জহির সিকদার। এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতা লিয়াকত আলী মেম্বারের পরিবার সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। লিয়াকতের মোবাইল নাম্বার থেকে আমাকে ফোন করে তার স্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য সংবাদকর্মীদের সাথে আমিও গিয়েছিলাম। পরে সংবাদের প্রয়োজনে মুঠোফোনে কয়েকবার কথা হয়েছিল। এই মুঠোফোনে যোগাযোগটাকে ইস্যু বানানো হয়।
অথচ তাদের সঙ্গে ফোনে কি কথা হয়েছিল, তার কল রেকর্ড শুনতে বলার পরও শোনেনি। খু’নের ঘটনায় গ্রে’ফতার দেখিয়ে ক্রেডিট নিতে আমার মত নিরীহ মানুষটাকে শি’কার করলো খাইরুলচক্র!

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জালেমের বিচার দেখতে পরকাল পর্যন্ত যেতে হবে না। দুনিয়াতেই দৃষ্টান্ত প্রচুর। মানুষরূপী জা’নোয়ারদের মাফ করব না। আল্লাহর কসম, কোন মাফ নাই। দুনিয়াতেই তাদের জিল্লতি দেখে যেতে চাই। আমি কিছু করবো না। কারাজীবনে চোখের পানির প্রতিটি ফোঁটা ‘অভিশাপের গুলি’ বানিয়ে ছেড়ে দিলাম। অমানুষদের বুক বিদ্ধ করুক। আল্লাহ ন্যায় বিচারক।

৫ বছর পরে খালাস:
সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে পাঁচ বছর লাগলেও সত্যটা বের হলো। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে মিথ্যা অভিযোগ থেকে খালাস পেলাম। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। শ্রদ্ধা আদালতের প্রতি।

কৃতজ্ঞতা:
সেই সময়কার স্বৈরাচার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যারা আমার পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন; জুলুমের প্রতিবাদ করেছেন, আমার অসহায় পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, সবার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আর লেবাসধারী ভালো মানুষ, ভীতু, কু’চক্রী, দালাল-দোসরদের জন্য দোয়া রইলো।
সবার ভূমিকা ও আচরণ স্মরণে থাকবে আজীবন।

প্রশ্ন… ❓
১. গ্রেফতারের পর মামলায় জামিন এবং ৫ বছরে অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তার ক্ষতিপূরণ কে দিবে?
২. ৫ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় নষ্ট করা সময়গুলোর হিসাব কে করবে?
৩. আইনি পোশাক পরা অপরাধীরা আমার জেলখানার সময়টুকু স্বাভাবিক জীবনের মতো করে ফেরত দিতে পারবে?
৪. পিতাকে টর্চার ও গ্রেফতারের খবরে আমার অবুঝ সন্তানরা যে ট্রমার মধ্যে সময় কাটিয়েছে তার সঠিক জবাব কার কাছে চাইবে তারা?
৫. সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের সাথে বেআইনি ও অসদাচরণের বিচার কার কাছে পাব?

মরহুম জহির সিকদারের খু’নিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আল্লাহ তাকে মাফ করুন।

ইমাম খাইর
স্বৈরাচার আমলে কারানির্যাতিত সাংবাদিক
⌚০১ অক্টোবর ২০২৬ ইং।