পলাশ বড়ুয়া::

এমনিতেই দেশের কৃষিজমির সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। যতটুকু জমি আছে, অব্যবস্থাপনার কারণে তার গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যার ফলে দেশের কৃষককে ন্যায্য মূল্যের বহু গুণ বেশি দামে জমি ভাড়া নিতে হয়, নয়তো বর্গা চাষের দুঃসহ ভার কাঁধে নিতে হয়।

তারপর শুরু হয় বীজ বাছাই থেকে দীর্ঘ এক সংগ্রাম। বীজতলা তৈরি, বীজ বপন, চারা রোপণের উপযোগী করা, চারা রোপণ, সেচ, আগাছা ও রোগবালাই দমন, গরু-ছাগল, পোকামাকড়-ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ফসল বাঁচানো।

অপরদিকে খরার মৌসুমে বিদ্যুৎ সংকট, সার সংকট, আবার বর্ষায় অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল। কোনো ঋতুতেই যেন কৃষকের লড়াই থামে না।

এত কিছু পার করে ফসল ঘরে তোলার পরও মাড়াই থেকে সংরক্ষণ, প্রতিটি ধাপে তার সামনে আসে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের প্রাচীর। বাড়তি ভাড়া গুনে গুদামজাত করেও দিনশেষে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্যটুকু পায় না।

অথচ অধিকাংশ কৃষকই ঋণের ভার কাঁধে নিয়ে ফসল ফলায়। এই দীর্ঘ পথচলার কোথাও এতটুকু বিভ্রাট হলেই কেউ হতাশার অন্ধকারে ডুবে যায়, কেউ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়।

কথাগুলো বলছি কারণ আজ কক্সবাজারের উখিয়া আসার পথে দেখলাম, রাস্তায় শত শত মানুষ জড়ো হয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ত্রাণের আশায় তারা দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি, প্রত্যেকের হাতে খালি বস্তা। সবাই সারের জন্য অপেক্ষমাণ। কেউ বলছে, “এই তো এখনই আসবে।” কেউ দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে।

অথচ এই মানুষগুলো কারো করুণা চাইছে না। তারা টাকার বিনিময়ে সার কিনবে, জমিতে দেবে, ফসল ফলাবে। সেই ফসল দিয়ে আগে নিজের ও দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেবে, আর উদ্বৃত্ত হলে রপ্তানি করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনবে।

একেকজন কৃষক কতটা ত্যাগ, কতটা লড়াই পেরিয়ে তারা এই কাজটি করে, একবার ভেবে দেখুন তো। দেশের সব কৃষক যদি একটিবার ফসল ফলানো বন্ধ করে দেন, তবে দেশের মানুষের কী দশা হবে? তখন কি আর রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা গবেষকের কোনো মূল্য থাকবে? খাবে কি কোটি কোটি মানুষ?

অথচ এই কৃষকরাই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। সময় এসেছে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার।

তাদের জন্য নিশ্চিত করা হোক স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে, চাপমুক্ত হয়ে ফসল ফলানোর পরিবেশ।

কারণ তারা রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, বৃষ্টিতে ভেসে যে ফসল ফলায়, তাতেই বেঁচে থাকে এই দেশের প্রতিটি প্রাণ।

বলার ছিল আরও অনেক কথা, কিন্তু লেখকের সীমাবদ্ধতার কারণে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই তুলে ধরা হলো।

লেখক : গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী
# palashbr@gmail.com