জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

কক্সবাজারের সমুদ্রের ঢেউ কোনোদিন মিথ্যা বলে না। দিনের আলোয় এই শহর যতটা সুন্দর, রাতের অন্ধকারে তার কিছু চিত্র ততটাই বিব্রতকর। পর্যটনের নামে যদি এমন একটি সংস্কৃতি ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়, যেখানে মাদক, অনিয়ন্ত্রিত রাতের বিনোদন, অশালীনতার অভিযোগ, সহিংসতা এবং তরুণ প্রজন্মকে বিপথে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়, তবে সেটিকে নিছক ব্যবসা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি তখন সামাজিক সংকট, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

কক্সবাজারের মানুষ পর্যটনের বিরুদ্ধে নয়। বরং পর্যটন এই শহরের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু পর্যটনের নামে এমন কোনো সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না, যা একটি প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং শহরের স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে।

কক্সবাজারের হোটেল ও রাতের বিনোদনকেন্দ্র নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল দ্য রয়েল রিড-কে ঘিরেও বিভিন্ন ধরনের আলোচনা শোনা যায়। সেখানে নৃত্য ও গানের আয়োজন, বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনা এবং রাতের বিনোদনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের বৈধতা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পরিচালনাবিধি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাই থাকা জরুরি।

কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানকে শুধু নাম বা জনশ্রুতির ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগ বা জনউদ্বেগকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল প্রশাসনের কাজ হতে পারে না। অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কক্সবাজারে রাতের বিনোদনকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও রয়েছে। রেনেসাঁ হোটেলের বারে সংঘর্ষে দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যই প্রকৃত সত্য নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত।

এখন প্রশ্নটি কোনো একটি হোটেল বা একটি বারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো—একটি পর্যটন শহরের রাতকে রাষ্ট্র কতটা দায়িত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে?

মাদকবিরোধী আইন শুধু কাগজে রাখার জন্য তৈরি হয়নি। মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ও রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ। তারপরও যদি কক্সবাজারে মাদক নিয়ে বারবার অভিযান চালাতে হয়, যদি ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার অব্যাহত থাকে, যদি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য সমাজকে বারবার সতর্ক করতে হয়, তাহলে কেবল নিচের সারির মাদক বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।

মাদকের পুরো অর্থনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। কারা আনে, কারা সরবরাহ করে, কারা বাজার তৈরি করে, কারা আশ্রয় দেয় এবং কোথায় এর ব্যবহার বিস্তার লাভ করছে—প্রতিটি স্তরকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা করা নয়; অপরাধের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। তরুণদের হাতে মাদক পৌঁছানোর পর অভিযান চালানো সহজ; কিন্তু তাদের হাতে মাদক পৌঁছাতে না দেওয়া রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য।

কক্সবাজারের তরুণ সমাজকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে। একটি তরুণ যখন মাদকের নেশায় ঢুকে যায়, তখন শুধু একটি পরিবার ভাঙে না; একটি সম্ভাবনা ধ্বংস হয়। একজন শিক্ষার্থী যখন নেশার অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্নও ডুবে যায়। একজন যুবক যখন অপরাধচক্রের অংশ হয়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।

এই জায়গায় দায়িত্বশীলদের নীরবতা কোনো সমাধান নয়। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হোটেল ব্যবসায়ী, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব—সবারই দায়িত্ব আছে। কেউই বলতে পারেন না, বিষয়টি অন্য কারও দায়িত্ব।

ইসলাম মাদককে বৈধতা দেয় না। মাদক মানুষের বিবেক, শরীর, পরিবার ও সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একইভাবে এমন কোনো বিনোদন, যা আইন ও জনশৃঙ্খলার সীমা লঙ্ঘন করে কিংবা সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়, তাকে শুধু ‘বিনোদন’ শব্দ দিয়ে বৈধতার আবরণ দেওয়া যায় না।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হলেও রাষ্ট্রের আইন, জনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।

আমরা এমন কোনো বাংলাদেশ চাই না, যেখানে পর্যটনের অর্থ দাঁড়াবে রাত জেগে মাদক ও অনিয়ন্ত্রিত বিনোদনের বাজার তৈরি করা। আমরা এমন কক্সবাজার চাই না, যেখানে সমুদ্রের সৌন্দর্যের পাশে তরুণদের জন্য নেশার অন্ধকারও বিক্রি হবে। আমরা এমন উন্নয়ন চাই না, যার হিসাব শুধু হোটেলের আয় দিয়ে হবে, কিন্তু তার সামাজিক ক্ষতির হিসাব কেউ রাখবে না।

হোটেল দ্য রয়েল রিড হোক কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান—আইনের বাইরে কারও অবস্থান থাকা উচিত নয়। সেখানে বৈধ কার্যক্রম হলে প্রশাসন তা স্পষ্ট করুক। কোনো নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক। অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও পরিষ্কার করুক। কিন্তু নীরবতা, অস্পষ্টতা ও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই চলতে পারে না।

কক্সবাজারের রাতকে রাতের অন্ধকারের কাছে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। প্রশাসনের উচিত পর্যটন এলাকার সব রাতের বিনোদনকেন্দ্রের লাইসেন্স, অনুমোদন, সময়সীমা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করা। মাদকবিরোধী অভিযানকে কেবল রাস্তার দৃশ্যমান বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরবরাহ ও অর্থের মূল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।

একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, পাঠাগার, সৃজনশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ শুধু ‘মাদক খেও না’ বললে তরুণ প্রজন্ম মাদকমুক্ত হয় না; তাদের সামনে একটি অর্থবহ জীবনও তৈরি করতে হয়।

রাষ্ট্রের অধঃপতন শুরু হয় তখনই, যখন অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস কমে যায়। প্রশাসনের অবক্ষয় শুরু হয় তখনই, যখন অভিযোগ শুনেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে নীরবতা বেছে নেওয়া হয়। সমাজের অবক্ষয় শুরু হয় তখনই, যখন সন্তান হারানোর আগ পর্যন্ত অভিভাবক বুঝতে পারেন না যে সন্তানটি কোথায় যাচ্ছে।

তাই আজ কক্সবাজারের প্রয়োজন আরেকটি উৎসব নয়, আরেকটি আলোঝলমলে রাত নয়; প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। প্রয়োজন তরুণদের মাদক থেকে ফিরিয়ে আনার সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রয়োজন রাতের ব্যবসায় আইনের কঠোর নজরদারি। প্রয়োজন দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি। প্রয়োজন এমন প্রশাসন, যার কাছে কোনো হোটেলের নাম বড় নয়, কোনো ব্যবসায়িক প্রভাব বড় নয়, কোনো অর্থ বড় নয়—আইনই বড়।

সমুদ্রের শহরকে মাদকের শহর হতে দেওয়া যাবে না। কক্সবাজারের রাত বিক্রি হতে দেওয়া যাবে না।

একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোনো নাইট ক্লাব, কোনো মাদকচক্র কিংবা অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন ব্যবসার কাছে বন্ধক রাখা যাবে না।

আজ যদি রাষ্ট্র জেগে ওঠে, সমাজও জাগবে। আজ যদি প্রশাসন কঠোর হয়, অপরাধচক্রও পিছিয়ে যাবে। আজ যদি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ তরুণদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে মাদকের বাজারের সামনে একটি প্রজন্ম দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারবে।

কক্সবাজারকে শুধু পর্যটন নগরী নয়, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, মাদকমুক্ত ও মূল্যবোধসম্পন্ন পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ দাবি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; এ দাবি একটি শহরের ভবিষ্যতের পক্ষে। এ প্রতিবাদ কোনো বৈধ বিনোদনের বিরুদ্ধে নয়; এ প্রতিবাদ অনিয়ম, মাদক, সামাজিক অবক্ষয় এবং দায়িত্বশীলতার অবহেলার বিরুদ্ধে।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
ই-মেইল: mdraiyan6790@gmail.com