এম. মনছুর আলম, চকরিয়া:
মানুষ অসুস্থ হলেই আশ্রয় খোঁজেন নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসকের কাছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। জীবনের সঙ্গে লড়াই করা শত শত রোগীর ভিড়ে হাসপাতালটি যেন পরিণত হয়েছে মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রতিটি ওয়ার্ড রোগীতে পরিপূর্ণ। একদিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১১ জন, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সব শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও চিকিৎসাসেবা থেকে কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত রোগীদের ওয়ার্ডের করিডোরে রেখেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
হাসপাতালের এ দৃশ্য যেমন বাড়তি দায়িত্বের পরিচয় বহন করছে, তেমনি সীমিত জনবল নিয়েও চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবিকতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও তুলে ধরছে।
জানা গেছে, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেকেরও কম নিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তবুও চিকিৎসক, স্টাফ নার্স, স্যাকমো, ওয়ার্ডবয় ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তীব্র গরম, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও তাঁদের সেবার মানসিকতায় কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। প্রতিটি রোগীর সুস্থতা এবং স্বজনদের মুখে স্বস্তির হাসিই তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকা থেকে পাঁচ বছর বয়সী ছেলে তৌহিদ নাঈমকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “গত তিন দিন ধরে আমার ছেলের জ্বর ও তীব্র কাশি ছিল। ভালো চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে এসেছি। এসে দেখি সব বেড রোগীতে পূর্ণ। তারপরও করিডোরে রেখেই দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আগের তুলনায় হাসপাতালের সেবার মান অনেক উন্নত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালই যেন গরিব মানুষের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে থাকে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সাজেদা বেগম বলেন, “চিকিৎসকদের নিয়মিত তদারকি, দ্রুত সেবা এবং নার্সদের আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ। গত দুই দিনের চিকিৎসায় অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি। হাসপাতালের এই মানবিক সেবার ধারাবাহিকতা যেন ভবিষ্যতেও বজায় থাকে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ জায়নুল আবেদীন বলেন, হাসপাতালের সেবার মান আরও উন্নত করতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ বিবেচনায় চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য জনবল, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমাদের সামর্থ্য সীমিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার সীমাহীন। চকরিয়াবাসীর ভালোবাসা, আস্থা ও সহযোগিতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সকলের সহযোগিতা ও দোয়ায় আমরা আরও উন্নত, আরও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।”
চিকিৎসাসেবার এই ব্যতিক্রমী চিত্র প্রমাণ করে, অবকাঠামো ও জনবলের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মানসিকতা থাকলে সরকারি হাসপাতালও মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
