নিজস্ব প্রতিবেদক:
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের পুরাতন পাড়ার বাসিন্দা মুক্তার আহমদের ছেলে হ্নীলার মঈন উদ্দিন মেমোরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী শফি উল্লাহ শফি। যিনি গত ৪ জুলাই বিকালে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। শুধুমাত্র বসত ঘরের চলাচলের রাস্তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে প্রাণ দিয়ে হয়েছে এই কলেজ শিক্ষার্থীকে। দীর্ঘদিন ধরে সৃষ্ট বিরোধ, আদালতে মামলা, একাধিক বার থানায় সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও প্রভাবশালী চক্রের হাতে বন্ধ ছিল রাস্তাটি। অথচ শফি উল্লাহ হত্যার পর সেই রাস্তাটি উন্মুক্ত করে দিয়েছে প্রভাবশালীরা।
আর এর মধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ে থাকা মামলার এজাহারভূক্ত আসামিদের অব্যাহত হুমকির কারণে টেকনাফ ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে মামলার বাদি এবং নিহতের ভাই বিদেশ ফেরত ছিদ্দিক আহমদ।
তিনি প্রতিবেদকে ঢাকায় অবস্থান করার কথা স্বীকার করেছেন। তার অভিযোগ, মামলার এজাহারভূক্ত প্রধান আসামি জামায়াতের সহযোগী সংগঠন শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের সাবরাং ইউনিয়ন সভাপতি ইসমাইল, ৫ নম্বর অভিযুক্ত ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামাল উদ্দিন। মামলাটির এজাহারভূক্ত মোট ১০ জন আসামি রয়েছে। অপর ৮ জনই এই দুইটি পরিবারের সদস্য। যে মামলায় ৭ নম্বর আসামি ইলিয়াসকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও অপর ৯ আসামি এখন দলীয় পরিচয়ে প্রকাশ্যে ঘুরছেন। বিশেষ করে  শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের সাবরাং ইউনিয়ন সভাপতি ইসমাইল ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামাল উদ্দিন প্রকাশ্যে ঘুরে বাদিকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন।
ছিদ্দিক আহমদ জানান, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে বাড়ির চলাচলের রাস্তাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি কামাল আহমদ ও সাবরাং ইউনিয়ন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ইসমাইল। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে রাস্তাটি দখল করে ব্ন্ধ করে দেয়া হয়। এ বিষয়টি স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকবার মিমাংসার চেষ্টাও করা হয়। এব্যাপারে আদালতে একটি মামলা করা হলে সেই মামলার তদন্তে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই ৪ জুলাই শফি উল্লাহ শফিসহ তার পরিবারের সদস্যের ওপর জামায়াত নেতা ইসমাইল ও বিএনপি নেতা কামালের নেতৃত্বে হামলা চালায়। সেই হামলায় শফি উল্লাহ শফি গুরুতর আহত হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। ভাইয়ের মৃত্যুর ওই চলাচলের রাস্তাটি এখন উন্মুক্ত করে দিয়েছে প্রভাবশালীরা।
অথচ এই চলাচলের রাস্তাটি নিয়ে একাধিক অভিযোগের নথিপত্র প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। যেখানে দেখা গেছে, গত ১৬ জুন ছিদ্দিক আহমদের স্ত্রী সেলিনা আক্তার সেলি বাদি হয়েছে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। যেখানে একই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে   চাঁদা দাবিতে ঘরের চলাচলের রাস্তা দখল করে বন্ধ করার অভিযোগ আনা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য টেকনাফ থানাকে নিদের্শ দেন। এর পর থেকে শুরু হয় অভিযুক্তদের ধারাবাহিক হুমকি। যার জের ধরে ২১ জুন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে সেলিনা আক্তার সেলি লিখিত আবেদন করেন। ওই আবেদনটিতেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে আসা প্রবাসি স্বামী সহ পরিবারের স্বজনদের হুমকি অভিযোগ আনা হয়। এরপর ৩০ জুন ছিদ্দিক আহমদ বাদি হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন টেকনাফ থানায়। যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়।
সেলিনা আক্তার সেলি জানান, আদালতে দায়ের করা মামলাটির তদন্ত করতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় ছিল ৪ জুলাই বিকালে। এর জন্য সকলের ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে অভিযুক্তরা হামলা চালায়। এতে মারা যান শফি উল্লাহ। তার মৃত্যুর পর রাস্তাটি নিজেরা ছেড়ে দিয়েছেন।
মামলার বাদি নিহতের ভাই বিদেশ ফেরত ছিদ্দিক আহমেদ বলেন, আমার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। আমার পরিচয় আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের রাজস্বে ভূমিকা রাখি। কিন্তু, দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমাকে অসহায় করেছে। ভাইকে হত্যার পর তারা আমাদের চলাচলের রাস্তা উন্মুক্ত করে দেয় রাতের আঁধারে। আমার ভাইকে একটা রাস্তার জন্য, অধিকারের জন্য জীবন দিতে হলো। এটা কেমন সমাজ, কতটা নিকৃষ্ট মানুষ হলে তারা এসব করতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি আমার পরিবারের আস্থা আছে। তাই মামলা দায়ের করেছি। কিন্তু এই মামলা থেকে কামাল ও ইসমাইলকে বাদ দেওয়ার জন্য এবং আমি ও আমার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে নতুন করে আবারও হত্যার পরিকল্পনা করছে তারা। ফলে আমাকে দীর্ঘদিন পর দেশে এসেও পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি সরকারের কাছে আমার পরিবারের সকল সদস্যদের নিরাপত্তা চাই।
তিনি বলেন, সরকার দলীয় পরিচয়ের বাইরে প্রকৃত খুনের সাথে জড়িত জামায়াত নেতা ইসমাইল ও বিএনপি নেতা কামাল গং এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিবেন।
এদিকে কামাল উদ্দিনকে হত্যা মামলা থেকে বাদ দিতে টাকার মিশন নিয়ে নেমেছে একটি পক্ষ এমন অভিযোগও করেন বাদি।
এ ব্যাপারে টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই ৭ নম্বর আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এব্যাপারে তিনি বাদির সহযোগিতা চেয়েছেন।