ফুটবল, কার্নিভাল, সাম্বার ছন্দ আর অ্যামাজনের বিস্তীর্ণ অরণ্যের দেশ ব্রাজিল। বিশ্বের বৃহত্তম ক্যাথলিক জনগোষ্ঠীর এই দেশে ইসলাম এখনো সংখ্যালঘু ধর্ম। তবে সংখ্যায় ছোট হলেও ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নতুন মসজিদ নির্মাণ, ইসলামিক শিক্ষা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, স্থানীয়দের ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্যের চর্চা সব মিলিয়ে দেশটিতে ইসলামের উপস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনুভূত হচ্ছে।

ব্রাজিলের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা IBGE–এর ২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটিতে মুসলিমের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.১ শতাংশ।

তবে ব্রাজিলের বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন বিশেষ করে Federation of Muslim Associations in Brazil (FAMBRAS)–এর দাবি, দেশটিতে বর্তমানে মুসলিমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৫ লাখের মধ্যে হতে পারে। যদিও এ দাবির সরকারি পরিসংখ্যানভিত্তিক নিশ্চিতকরণ নেই।

ব্রাজিলে ইসলামের আগমনের ইতিহাস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন, ১৫০০ সালে পর্তুগিজ অভিযাত্রী পেদ্রো আলভারেস কাবরালের অভিযানে মুসলিম নাবিকও থাকতে পারেন। আবার কেউ কেউ দাবি করেন আরব নাবিকেরা পর্তুগিজদের আগেই দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে পৌঁছেছিলেন। তবে এসব বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সুস্পষ্ট ঐকমত্য নেই।

তবে একটি বিষয় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে ১৬শ শতক থেকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আনা বিপুলসংখ্যক মুসলিম দাস ব্রাজিলে ইসলামের প্রথম সংগঠিত উপস্থিতি তৈরি করেন। দাসত্ব, নির্যাতন ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের মধ্যেও তারা ইসলামী বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করেন।

পরবর্তীকালে ১৯শ ও ২০শ শতকে সিরিয়া, লেবানন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত অভিবাসীরা ব্রাজিলের মুসলিম সমাজকে নতুন ভিত্তি দেন। তাঁদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে আধুনিক মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে ব্রাজিলে দেড় শতাধিক মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার রয়েছে বলে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন জানিয়েছে। এর মধ্যে বৃহত্তর সাও পাওলো অঞ্চল দেশটির মুসলিম জীবনের প্রধান কেন্দ্র। এছাড়া পারানা, কুরিতিবা, ফোজ দো ইগুয়াসু, ক্যাম্পিনাস এবং সান্টোস শহরেও সক্রিয় মুসলিম সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে।

এসব মসজিদ শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কিংবা জুমার জামাতের জন্য ব্যবহৃত হয় না। কুরআন শিক্ষা, ইসলামিক গবেষণা, দাওয়াহ কার্যক্রম, আন্তধর্মীয় সংলাপ, সমাজসেবা এবং নতুন মুসলিমদের সহায়তার কেন্দ্র হিসেবেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ব্রাজিলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়েছে বলে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইসলামিক সেন্টারের উন্মুক্ত কার্যক্রম এবং আন্তধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে অনেক ব্রাজিলিয়ান ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।

মুসলিম সংগঠনগুলোর দাবি, প্রতিবছর নতুন করে বহু ব্রাজিলিয়ান ইসলাম গ্রহণ করছেন। তাঁদের মধ্যে নারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। যদিও এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই।

লেবাননী ও সিরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। টেক্সটাইল, খাদ্যশিল্প, আমদানি-রপ্তানি ও সেবাখাতের পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।

একই সঙ্গে আরব সংস্কৃতি, স্থাপত্য, খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য ব্রাজিলের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের ভেতরেও ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ নিজেদের অবস্থান ধীরে ধীরে সুসংহত করছে। নতুন মসজিদ নির্মাণ, শিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তার, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয়দের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে দেশটিতে ইসলামের উপস্থিতি আগের তুলনায় আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

সংখ্যায় তারা ছোট হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস, সাংস্কৃতিক অবদান এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ আজ দেশটির বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তথ্যসূত্র

  • IBGE-2010 Population Census
  • Federation of Muslim Associations in Brazil (FAMBRAS)
  • Pew Research Center
  • Encyclopaedia Britannica
  • বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণা ও ব্রাজিলের মুসলিম সংগঠনের প্রকাশিত তথ্য

আবদুল নবী, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি