নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলার আগে অন্তত তিনটি স্থানে রাস্তা কেটে নাশকতা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান ব্যাহত এবং যান চলাচল অচল করতে রাতভর এক্সকাভেটর দিয়ে এই কাজ করা হয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, ক্যাম্পে অতর্কিত হামলার আগমুহূর্তে কৌশলগতভাবে রাস্তা কেটে দেওয়ার ঘটনা থেকে স্পষ্ট, এটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রোববার (২৪ মে) রাত ১২টার পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরীণ সড়কে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়।
পাহাড়ি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়কের অন্তত তিনটি পয়েন্টে গভীর গর্ত তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে সড়কজুড়ে মাটি ফেলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যাতে জরুরি সময়ে র্যাব বা পুলিশের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সরকারি বাহিনীর চলাচল বাধাগ্রস্ত এবং ক্যাম্পকে বিচ্ছিন্ন করতেই এই পরিকল্পিত নাশকতা চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
প্রশাসনিকভাবে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও ভৌগোলিক কারণে এলাকাটিতে প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার বাংলাবাজার হয়ে। বায়েজিদ লিংক রোড থেকে পাহাড় ও জঙ্গলঘেরা দুর্গম এ জনপদে যাতায়াত করতে হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ২০০২-০৩ সালের দিকে এলাকায় অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা শুরু হয়। পরবর্তীতে পুরো অঞ্চলটি ১১টি ‘সমাজে’ বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে আলীনগর এলাকা ‘আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে পরিচালিত হলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল স্থানীয় সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের হাতে। পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় এলাকাটি।
গত দুই দশকে এই পাহাড়ি জনপদে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা বাধার মুখে তা সফল হয়নি। বরং বিভিন্ন অভিযানে সরকারি কর্মকর্তাদের হামলার মুখেও পড়তে হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের সমন্বয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের পর এলাকাটিকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এনে সন্ত্রাসীদের পুনর্গঠন ঠেকাতে সেখানে অস্থায়ী চৌকি স্থাপন করা হয়।
গত ১৭ মে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছিলেন, সরকার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি আধুনিক পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
এদিকে, ৯ মার্চের অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, প্রভাবশালী সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু চক্রের নির্দেশেই সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “সন্ত্রাসীদের সাম্রাজ্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তাই তারা প্রতিরোধের চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
