নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম মহানগরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বারবার আলোচনায় আসছে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তদন্ত, একাধিক হত্যা মামলা, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং সর্বশেষ চকবাজারে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার ঘটনায়ও তার নাম উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডেভিড ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায়। বড় সাজ্জাদ বিদেশে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে তার অপরাধচক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে ডেভিড ইমন কাজ করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ নগরীর বাকলিয়ার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলার অন্যতম আসামি তিনি। এছাড়া পতেঙ্গার আলোচিত ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক ঘটনায়ও তার নাম এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, এসব ঘটনায় হামলাকারীদের সমন্বয়, অস্ত্রধারীদের পরিচালনা এবং পরিকল্পনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ‘ছোট সাজ্জাদ’ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীরা মাঠপর্যায়ে সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে ব্যবসায়ী, ঠিকাদারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চাঁদা আদায়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস রোডে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন)-এর কার্যালয়ে ১৫ থেকে ২০ জন অস্ত্রধারী হামলা চালায়।
হামলাকারীরা অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুট করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, হামলার দুই দিন আগে বিদেশি নম্বর থেকে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি ফোন করেন। তিনি এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অফিসে হামলার হুমকি দেওয়া হয়।
এর দুই দিন পরই সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয় এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অভিযোগে ডেভিড ইমনের নাম এলেও বিষয়টি তদন্তাধীন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে একটি খবর ভাইরাল হয়। পরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানায়, ওই তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর নামে প্রচারিত বক্তব্যও ভুয়া বলে জানানো হয়।
সিএমপির সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ বলেন, ভাইরাল হওয়া ফটোকার্ড ও বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি গুজব না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ডেভিড ইমনকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাকে আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে চকবাজারে ডিডিএন কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিরুল রশীদ বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি বারবার একই নাম ব্যবহার করেছে। তবে কারও নাম ব্যবহার করলেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয় না। কমিশনারের নির্দেশনায় তাকে এবং তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।”
তিনি আরও জানান, বিদেশি ফোন নম্বর ও বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ করায় তদন্তে কিছু জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তবুও তাকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, হামলার ঘটনায় মামলা হওয়ার পর থেকেই পুলিশ নিরবচ্ছিন্নভাবে অভিযান চালাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের কাজ চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত জানানো সম্ভব না হলেও অচিরেই অগ্রগতির তথ্য জানানো হবে।
ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনার পর চট্টগ্রামের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) চট্টগ্রাম বিভাগের উদ্যোগে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিএবি চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার বলেন, ডিডিএনের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; সাম্প্রতিক সময়ে আইএসপি খাতে চাঁদাবাজি, প্রাণনাশের হুমকি ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি ডেভিড ইমন ও হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আইএসপি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—ডিডিএনে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, আইএসপি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনের পর প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগে ইন্টারনেট সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন।
