সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আলীকদম;
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা মেঘ, চারপাশে সবুজের সমারোহ আর দূরে নীল সমুদ্রের হাতছানি—একসঙ্গে এমন দৃশ্য দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন বান্দরবানের আলীকদমের মারাইংতং পাহাড়চূড়ায়। পাহাড়, মেঘ ও সাগরের অপূর্ব মেলবন্ধনের কারণে জায়গাটি অনেকের কাছে ‘দ্বিতীয় সাজেক’ নামেও পরিচিত।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট উঁচু এই পাহাড়ি এলাকায় দাঁড়ালে চারপাশের পাহাড়, বনভূমি এবং দূরের বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি দেখা যায়। ভোরে মেঘের চাদর আর বিকেলে সূর্যাস্ত—দুই সময়েই বদলে যায় মারাইংতংয়ের রূপ।
মারাইংতং পাহাড়ে যা দেখবেন
মারাইংতং পাহাড়ের প্রধান আকর্ষণ হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য। মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ানোর সময় পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে, আপনি যেন মেঘের রাজ্যে আছেন।
এখান থেকে আশপাশের পাহাড়ি বন, মাতামুহুরী নদী এবং আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে দূরের সমুদ্রও দেখা যায়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্যও জায়গাটি বেশ উপযোগী।
মারাইংতং পাহাড়ে ভ্রমণের পাশাপাশি চাইলে কাছাকাছি আলীর গুহা, ডিম পাহাড়, মায়া লেক, সীমান্তঘেঁষা সড়ক ও মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ঘুরে দেখা যায়।
ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে মারাইংতং পাহাড়ে যাওয়ার সহজ উপায় হলো কক্সবাজার বা আলীকদমগামী বাসে যাওয়া। কক্সবাজারগামী বাসে উঠলে চকরিয়া বাস টার্মিনালে নামতে হবে। এরপর চকরিয়া থেকে লামা-আলীকদম সড়ক ধরে স্থানীয় বাস, জিপ, চাঁদের গাড়ি কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মারাইংতংয়ের দিকে যেতে পারবেন।
চকরিয়া থেকে মারাইংতং পাহাড়ের দূরত্ব প্রায় ৩২ কিলোমিটার। স্থানীয় যানবাহনে যেতে সাধারণত দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে। আলীকদমের আবাসিক এলাকার রাস্তার মাথায় নেমে সেখান থেকে প্রায় ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা হাঁটলেই মারাইংতং পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।
ঢাকা থেকে আলীকদম যেতে যানজট ও বাসের ধরন অনুযায়ী পুরো যাত্রায় সাধারণত ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা সময় হাতে রাখা ভালো।
কত টাকা খরচ হবে
ঢাকা থেকে কক্সবাজার বা চকরিয়াগামী বাসের ভাড়া বাসের ধরন ও আসনের মান অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। চকরিয়া থেকে আলীকদমের আবাসিক এলাকার রাস্তার মাথা পর্যন্ত স্থানীয় বাস বা জিপে জনপ্রতি আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ টাকা লাগতে পারে। এরপর পাহাড়ের চূড়ায় যেতে জনপ্রতি প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা খরচ হতে পারে।
যারা একটু আরাম করে যেতে চান, তারা চকরিয়া থেকে ব্যক্তিগত জিপ বা চাঁদের গাড়ি ভাড়া করতে পারেন। দল বড় হলে পুরো গাড়ি ভাড়া নিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে।
ট্রেকিং করতে চাইলে
আবাসিক এলাকার রাস্তায় নেমে পায়ে হেঁটে মারাইংতং পাহাড়ের চূড়ায় যেতে খুব কঠিন ট্রেকিংয়ের প্রয়োজন হয় না। আলীকদমের মূল সড়ক থেকে চাঁদের গাড়িতে মুরুংপাড়া পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে প্রায় ৩০ মিনিট পাহাড়ি পথে হাঁটলেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যায়।
পাহাড়ি পথ হওয়ায় সঙ্গে ভালো গ্রিপের জুতা রাখা জরুরি। বর্ষার সময় পথ পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। তাই সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করা উচিত।
কোথায় থাকবেন
একদিনে ঘুরে ফিরে আসা সম্ভব হলেও মারাইংতং পাহাড়ের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে রাতে থাকা যেতে পারে। পাহাড়ের ওপর তাঁবু টাঙিয়ে থাকার পাশাপাশি জুমঘরসহ বিভিন্ন আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।
কখন যাবেন
মেঘ দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ থেকে শীতের শুরুর সময় মারাইংতং পাহাড়ে ভ্রমণ বেশ আকর্ষণীয়। তবে বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তা পিচ্ছিল থাকে। নভেম্বরের দিকে আবহাওয়া তুলনামূলক পরিষ্কার থাকায় পাহাড় ও দূরের সমুদ্র দেখার সুযোগও ভালো থাকে।
যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা, পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার নেওয়া এবং দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করা ভালো। পাহাড়ে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে স্থানীয় পরিবেশ ও বাসিন্দাদের প্রতি সম্মান দেখানোও ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শহরের ব্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে প্রকৃতির কাছে ফিরতে চাইলে মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ বন আর দিগন্তে সমুদ্র দেখতে মারাইংতং পাহাড় হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য।
