জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:

কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অধ্যুষিত আশপাশের এলাকার কয়েকটি ফার্মেসি রীতিমতো মিনি হাসপাতালে পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফার্মেসির পেছনে বড় পরিসরে কক্ষ তৈরি করে একাধিক বেড বসিয়ে সেগুলোকে মিনি হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়েছে। ফার্মেসিসংশ্লিষ্ট এসব মিনি হাসপাতালে কর্মচারীদের দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফার্মেসির পেছনে স্থাপিত এসব মিনি হাসপাতালের অবজারভেশন বেডে রোগীদের ভর্তি রেখে ওপিডি ও আইপিডির আদলে দিন-রাত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা টাওয়ার এলাকার স্টেশনের রহমান মোস্তফা সুপার মার্কেটে ‘মেসার্স বর্ণ মেডিকো’ নামে এমনই একটি ফার্মেসি রয়েছে। সাইনবোর্ডে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, ওই ফার্মেসিতে সব ধরনের ডাক্তারি ওষুধ পাওয়া যায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে পরীক্ষিত শর্মা নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন।

স্থানীয় লোকজন ও রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, পরীক্ষিত শর্মা জটিল ও কঠিন রোগেরও চিকিৎসা করেন। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসার নামে পরীক্ষিত শর্মা দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আসছেন।

স্থানীয়দের দাবি, চিকিৎসাক্ষেত্রে তার কোনো ন্যূনতম একাডেমিক যোগ্যতা না থাকলেও তিনি বর্ণ মেডিকোতে বসে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। তার কথিত অপচিকিৎসায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয়দের অনেকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসার কারণে স্থানীয় নারীসহ অনেকের মৃত্যু হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় এক ভুক্তভোগী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “পরীক্ষিতের কারণেই আমার মেয়েকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে। তার কথিত চিকিৎসার কারণে আমার একমাত্র মেয়েটি মারা গেছে। তখন মেয়েকে হারিয়ে আমি কোনো ব্যবস্থা নিতে চাইনি।”

বর্তমানে ওই ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা পরীক্ষিত শর্মার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীরা অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও জরুরি ভিত্তিতে কথিত অপচিকিৎসা বন্ধে পরীক্ষিত শর্মার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এদিকে স্থানীয় লোকজন ও রোহিঙ্গাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লেদা টাওয়ার এলাকার রহমান মোস্তফা সুপার মার্কেটের বর্ণ মেডিকোতে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের সামনের অংশে ফার্মেসি। সেখানে লোকজন লাইনে দাঁড়িয়ে ওষুধ কিনছেন। কয়েকজন ক্রেতার অভিযোগ, ফার্মেসিতে ওষুধের অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে এবং ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ক্যাশ মেমো দেওয়া হচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, বর্ণ মেডিকোর পেছনে অবৈধ ওষুধ মজুত করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, দোকানের মাঝখানে চিকিৎসকের পোশাকে একজন ব্যক্তি বসে আছেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনিই পরীক্ষিত শর্মা। তার ডান পাশে ও পেছনে রোগীদের জন্য কয়েকটি বেড রাখা হয়েছে।

এ সময় কাইয়ুম নামের এক রোহিঙ্গা কর্মচারীকে একটি শিশুকে ইনজেকশন দিতে দেখা যায়। শিশুটির মা জানান, কাইয়ুমসহ ফার্মেসির কর্মচারীরাই তাদের ও অন্যান্য রোগীদের ইনজেকশন ও স্যালাইন দিয়ে থাকেন।

রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলার সময় চিকিৎসকের পোশাকে থাকা ব্যক্তি হঠাৎ সেখান থেকে চলে যান। পরে দেখা যায়, ফার্মেসির পেছনে একটি বড় গেট রয়েছে, যা রোগীদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, ওই গেট দিয়ে দিন-রাত রোগীরা আসা-যাওয়া করেন।

সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে পরীক্ষিত শর্মা সরে যাওয়ার পর সেখানে ওসমান, হামিদ, কাইয়ুম ও বায়তুল্লাহ নামের চারজন রোহিঙ্গাকে রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে সাংবাদিকদের পরিচয় জানতে পেরে তারাও পেছনের গেট দিয়ে চলে যান।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গা যুবকদের মাধ্যমে ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে বর্ণ মেডিকোতে বড় বড় চিকিৎসক বসেন—এমন প্রচার চালিয়ে রোগীদের সেখানে আনা হয়। তবে তাদের দাবি, সেখানে কোনো প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নিয়মিত বসেন না। বরং পরীক্ষিত শর্মা ও তার সহযোগীরাই রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

অভিযোগের বিষয়ে পরীক্ষিত শর্মার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনুমতি না থাকলেও আমরা প্রাথমিকভাবে করছি আর কি।” তবে দুই বছর আগে ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ফার্মেসিটি পরিদর্শনের সময় এসব বেড দেখেছেন এবং তখন তারা কিছু বলেননি বলেও দাবি করেন তিনি।

নিউজ এজেন্সি ‘বয়েজ সেভেন’ ও ‘বাংলা পোস্ট’-এর প্রতিনিধি স্থানীয় সংবাদকর্মী ফরিদুল আলম বলেন, পরীক্ষিত শর্মা চিকিৎসার নামে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, ল্যাব টেস্টের কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় এবং নিজের টেবিলে বসে মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করা হয়।

তিনি বলেন, সড়কের পাশে সার্টিফিকেটবিহীন একজন ব্যক্তি কীভাবে চিকিৎসার নামে রোগীদের সেবা দিয়ে আসছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। ফার্মেসির পেছনে গড়ে ওঠা কথিত মিনি হাসপাতাল ও সেখানে চিকিৎসার নামে পরিচালিত কার্যক্রম বন্ধে সিভিল সার্জন এবং টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

খুচরা ড্রাগ লাইসেন্স হিসেবে অনুমোদিত ‘বর্ণ মেডিকো’ ফার্মেসিতে তিন-চারটি অবজারভেশন বেড বসিয়ে রোগী দেখার বিষয়ে জানতে কক্সবাজার ঔষধ প্রশাসনের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক কাজী ফরহাদের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হয়। পরে তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো সাড়া না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মুহাম্মদ এনামুল হক বলেন, চিকিৎসাসেবার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণার কোনো সুযোগ নেই। এসব কাজে কখনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ ছাবের বলেন, “ফার্মেসিতে রোগী দেখার আদৌ কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া ফার্মেসির পেছনে বা সামনে বেড বসিয়ে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া কিংবা স্যালাইন দেওয়া মোটেও নিরাপদ নয়।”

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য কোনো অনুমোদন নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।