সিবিএন ডেস্ক : কক্সবাজারের তারকা হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁয় দেশি মুরগির নামে সোনালি মুরগি পরিবেশনের অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে এক পর্যটককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির বাদী হন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শুভ্র রুদ্র।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বর্তমানে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম ভাঙিয়ে এক পর্যটককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। একই ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
‘দেশি মুরগি’ চেয়ে সোনালি মুরগি পাওয়ার অভিযোগ
সূত্র জানায়, গত ৯ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন। তিনি হোটেল সী-গালের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন।
রাসেলের অভিযোগ, রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হোটেলের নিজস্ব রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে তিনি একাধিকবার নিশ্চিত হয়ে দেশি মুরগির মাংসের অর্ডার দেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারীরাও তাকে দেশি মুরগি পরিবেশনের কথা নিশ্চিত করেন।
কিন্তু খাবার পরিবেশনের পর স্বাদ নিয়ে তার সন্দেহ হয়। বিষয়টি তিনি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে জানালে তার অভিযোগ, দেশি মুরগির পরিবর্তে তাদের সোনালি মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়েছে।
রাসেলের দাবি, এ বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে সোনালি মুরগি পরিবেশনের বিষয়টি স্বীকার করা হয়। এমনকি তাদের হোটেলে ‘দেশি মুরগি’ হিসেবে মূলত সোনালি মুরগিই পরিবেশন করা হয় বলেও তাকে জানানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রতিকারের বদলে হুমকির অভিযোগ
ঘটনার পর রাসেল উদ্দিন বিষয়টি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে জানান। তবে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার না পেয়ে পরে তিনি সরকারের কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা—জিআরএসের অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও লিখিত অভিযোগ করেন।
রাসেলের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করার পর হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসান তাকে ফোন করেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে হুমকি দেন।
রাসেল উদ্দিন বলেন, “টাকার পরিমাণ নিয়ে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু রেস্তোরাঁয় বারবার জিজ্ঞেস করার পরও মিথ্যা বলে অন্য মুরগি দেওয়া হয়েছে। সেবার নামে খাবারের টেবিলে প্রতারণা এবং পরে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে হুমকির বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারিনি।”
‘তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে’
এদিকে, জাতীয় অভিযোগ সেলে করা অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকরা হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেন। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার সময় তিনি হোটেল কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রকাশিত একটি অডিও কথোপকথনে তাকে বলতে শোনা যায়, হোটেলের এমডির সঙ্গে মন্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে এবং তারেক রহমানের সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, “আমাদের হোটেলটা তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে।”
ওই কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার দাবি, স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিও প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি এ ধরনের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্রের দাবি, পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে এবং অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চাকরিচ্যুত মীর কামরুল হাসান
ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হোটেল সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল।
তিনি বলেন, “ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ম্যানেজারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।”
ভোক্তা অধিকারের তদন্তের নির্দেশ
শুধু হুমকির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা নয়, খাবার পরিবেশন নিয়ে পর্যটক রাসেল উদ্দিনের করা লিখিত অভিযোগটিও আমলে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সেবাস্টিন রেমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এর আগে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলেও অভিযোগ করেছিলেন রাসেল উদ্দিন। সেখানে তাৎক্ষণিক প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ করে পরে তিনি সরকারের কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
