আবু মোরশেদ চৌধুরী:
কিছু কবিতা, কিছু লেখা, কিছু কথা সময় পেরিয়ে গেলেও পুরোনো হয় না। বরং সময় যত এগোয়, ততই তাদের নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয়, কবি-সাহিত্যিকেরা শুধু তাঁদের সময়কে দেখেননি,তাঁরা যেন ভবিষ্যতের কিছু বাস্তবতাও অনুভব করেছিলেন।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাজা আসে যায়’ কবিতার কথাগুলো আজও আমাদের ভাবায়,
“রাজা আসে যায়, রাজা বদলায়,
নীল জামা গায়, লাল জামা গায়।
এই রাজা আসে, ওই রাজা যায়,
জামা বদলায়, শুধু পোশাকের রং বদলায়,
শুধু মুখোশের ঢং বদলায়…”
কী আশ্চর্য মিল! সময় বদলায়, ক্ষমতার মানুষ বদলায়, শাসনের ভাষা বদলায়, পোশাকের রং বদলায় কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলো কি বদলায়?
মানুষ কি সত্যিই তার প্রাপ্য মর্যাদা পায়?
ন্যায়বিচার কি সবার জন্য সমান হয়?
ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে কি সাধারণ মানুষের জীবনেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে?
নাকি আমরা শুধু নতুন মুখ দেখি, নতুন স্লোগান শুনি, নতুন প্রতিশ্রুতি পাই কিন্তু পুরোনো বাস্তবতার মধ্যেই আটকে থাকি?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার নাদের আলীর সেই প্রতিশ্রুতির কথাও মনে পড়ে,
“বড় হও দাদাঠাকুর, তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব…”
কিন্তু বড় হতে হতে সেই শিশুর মনে প্রশ্ন জাগে,
“নাদের আলী, আমি আর কত বড় হব?”
এই প্রশ্নটি আজ শুধু কবিতার চরিত্রের নয়। এটি যেন আমাদের সময়েরও প্রশ্ন।
প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। মানুষ বিশ্বাস করে। অপেক্ষা করে। সময় চলে যায়। প্রজন্ম বদলে যায়। কিন্তু প্রতিশ্রুত সেই ‘তিন প্রহরের বিল’ অনেকের কাছেই অধরা থেকে যায়।
তাই মনে হয়, মহান কবি ও লেখকদের কিছু সৃষ্টি শুধু সাহিত্য নয়,এগুলো সময়ের আয়না। তাঁরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, ক্ষমতার পালাবদল আর সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন এক জিনিস নয়।
রাজা বদলালেই রাজ্য বদলায় না।
মুখোশ বদলালেই মুখ বদলায় না।
প্রতিশ্রুতি বদলালেই বাস্তবতা বদলায় না।
প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসে, যখন মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকে এবং ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে মানুষের জীবনকে দেখা হয়।
সময়ের কাছে তাই আমাদের প্রশ্ন একটাই,
আমরা কি শুধু রাজা বদলানোর অপেক্ষায় থাকব, নাকি এমন একটি সমাজের জন্য কাজ করব, যেখানে রাজা নয় মানুষই হবে পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু?
হয়তো এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি।
উপলব্ধি
পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে
