সালাহউদ্দিন আহমদ ,এমপি

আমি এমন এক নগরীর কথা বলছি, যার বাতাসে ছড়িয়ে আছে অমিত সম্ভাবনার আলো, পানিতে লুকিয়ে আছে সোনালী সম্পদ, মৃত্তিকায় বিপুল ঐশ্বর্যের সমাহার। এ ঐশ্বর্য যেমন কখনও ফুরায় না, এ সম্ভাবনাও কখনও হারায় না। লোকমুখে তাই শোনা যায়, ‘এর বাতাসে উড়ে ডলার, পানিতে ভাসে তরল সোনা।’ হ্যাঁ, আমি বলছি কক্সবাজারের কথা। এটি এমন একটি জনপদ, যার একদিকে আছে পাহাড় ও বনভূমি আরেক দিকে সমুদ্র ও দ্বীপমালা। এর বনভূমি থেকে আসে উন্নত বৃক্ষরাজি, নদী ও সমুদ্র থেকে আসে রূপালী মাছ, পাহাড় ও সমতল ভূমি থেকে আসে খাদ্যশস্য, সমুদ্রের লোনা পানি থেকে আসে লবণ। এ জেলার মানুষের পরম সৌভাগ্য তাদের জন্য হয়েছে এমন এক অঞ্চল যা সম্পদে, প্রাচুর্যে পাল্লা দিতে পারে বিশ্বের যে কোন অঞ্চলের সাথে। পরম করুণাময়ের কাছে এ কৃতজ্ঞতার যেন অন্ত নেই।
এ দেশের বেকার যুবশ্রেণি পেট্রোডলারের স্বপ্নে দেশান্তরি হয়। তারা কি জানে কক্সবাজারের সামুদ্রিক পানিতে আছে তার চেয়েও বিপুল সম্ভাবনা? এ জেলাতেই উৎপন্ন হয় বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ ভাগ লবণ। বাকি পাঁচ ভাগ উৎপন্ন হয় চট্টগ্রামের কিছু অংশে। তাই দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতে পারে এ লবণ। সে লক্ষ্যেই বর্তমানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন প্রযুক্তিতে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের সাদা লবণ। বিসিক কর্তৃক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে লবণ চাষীদের। সাদা পলিথিন শীট ব্যবহারের মাধ্যমে লবণ চাষের এই নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি লবণের উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে পূর্বের তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
আমি এমন এক উপকূলীয় জেলার কথা বলছি যার সামুদ্রিক পানিতেই আছে কেবল চিংড়ি পোনা চাষের উপযোগী ঘনত্ব, যা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট কিংবা খুলনা অঞ্চলের কোথাও নেই। প্রকৃতির এ বিস্ময়কর অনুকূল্যে এ জেলায় ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে চিংড়ি পোনা হ্যাচারি শিল্পের। বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে পোনা। পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে কিছু ক্ষতিকর প্রবণতা। বর্তমানে কারেন্ট জাল, নেট জাল ও ফাইন জাল দিয়ে মাছের পোনা আহরণের প্রবণতা বাড়ছে, যা সাময়িক লাভের বিনিময়ে বিপুল মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাছের অন্যান্য প্রজাতির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু এটা হতে দেয়া যায় না। বিপুল সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এ ক্ষতিকর প্রবণতা প্রতিরোধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে আজ যে চিংড়ি রপ্তানি থেকে দুই হাজার কোটি টাকা আয় হচ্ছে, কাল তা থেকে আয় হতে পারে ন্যূনতম দশ হাজার কোটি টাকা।
কক্সবাজারের মাটির গভীরে, সাগরের তলদেশে ছড়িয়ে আছে খনিজ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। মিয়ানমার উপকূলে, কুতুবদিয়ার পশ্চিমে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে। অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে খনিজ তেলের। এ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলিত হলে অবহেলিত এ অঞ্চল নতুন শক্তিতে বলীয়ান হবে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকা সকল প্রতিকূলতা অপসারিত হবে। সাফল্যের মুখ দেখবে ‘এগ্রোকলজিক ইকোনমিক জোন’ বা ইকোজ।
আর একটি বিশাল সম্ভাবনা ইতোমধ্যেই আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের জন্য মহেশখালী-কুতুবদিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সম্ভাব্য যাচাই চলছে। এই বন্দর স্থাপিত হলে কক্সবাজারের চেহারা আমূল বদলে যাবে। বহির্বিশ্বের সাথে কক্সবাজার হবে অন্যতম প্রবেশদ্বার। সেই লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গৃহীত হয়েছে আরো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প। ইতোমধ্যে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালী দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযোগকারী সেতু নির্মিত হয়েছে। এখানে ভবিষ্যতে সমুদ্র বন্দর স্থাপিত হলে এই সেতুর গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি শ্রেষ্ঠ মাধ্যম পর্যটন। পৃথিবীর দীর্ঘতম বেলাভূমি বেষ্টিত কক্সবাজারই হলো বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী, যার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য আমরা প্রথম থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এ উদ্যোগের আওতায় এখানে গড়ে উঠেছে পর্যটন জোন। পর্যটকদের জন্য সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত রেস্টহাউজ গড়ে উঠেছে। এ ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। পর্যটন শিল্পে এখন দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ছে। পাশাপাশি শুরু হয়েছে কক্সবাজার বিমান বন্দরকে আরও সম্প্রসারিত ও মানসম্পন্ন করার প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আরও অধিক সংখ্যক সুপরিসর বিমান ওঠানামা করতে পারবে। হয়তো সেদিন দূরে নয়, যেদিন আন্তর্জাতিক মানের বিমান বন্দর কক্সবাজারেই গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে ১৯৯৩-৯৪ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়, যার সিংহভাগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ মেরিন ড্রাইভ রোডের দু’পাশে গড়ে উঠছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানা কর্মকাণ্ড। ফলে এ জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বেগবান হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম ও প্রশস্ততম বালুময় সৈকত, যার একপাশে রয়েছে সুউচ্চ পাহাড়ের বেষ্টনী। এত অপরূপ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত পৃথিবীতে বিরল। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ প্রাকৃতিক সৈকত আমাদের পর্যটন শিল্পকে সারা বিশ্বে পরিচিত করতে পারে। কক্সবাজার পেতে পারে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্যটন রাজধানীর মর্যাদা।
কক্সবাজারেই রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ যার নাম ‘সেন্টমার্টিন’। পূর্বে এ দ্বীপের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই অনুন্নত। বর্তমানে সি-ট্রাক ও সমুদ্র যাতায়াতের মাধ্যমে তাকে সহজতর করা হয়েছে। পাশাপাশি চলছে এ দ্বীপকে আধুনিক পর্যটন সুবিধা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া। এছাড়া গর্বের সোনাদিয়া দ্বীপকে পর্যটনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চকরিয়াতে দেশের প্রথম এবং একমাত্র সাফারি পার্ক ‘ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক’কে আরও সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর ফলে পর্যটন ক্ষেত্রে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। পর্যটকদের আগমনও বৃদ্ধি পাবে।
উখিয়া-টেকনাফের জনপদ দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশ টেলিভিশন নেটওয়ার্কের আওতা বহির্ভূত ছিল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে উখিয়ায় টিভি রিলে স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার জনগণ টেলিভিশন নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। কক্সবাজার বেতারকেন্দ্র স্থাপন বিএনপি সরকারের একটি বড় কৃতিত্ব। মূলত ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কক্সবাজারে একটি বেতারকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং সে লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ ও বাজেট বরাদ্দসহ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এ বেতারকেন্দ্র চালু হওয়ার ফলে সমুদ্রগামী জেলেরা নৌযান দুর্ঘটনা ও আবহাওয়ার আগাম সংকেত ও সংবাদ পাচ্ছে। সেই সাথে এলাকাবাসী স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সকল সংবাদ অনায়াসে জানতে পারছে। ফলে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কক্সবাজারের অগ্রগতি সূচিত হয়েছে।
জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সূচনাকাল থেকে কক্সবাজার ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির জেলার সমপর্যায়ের। তাকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার শর্ত হিসেবে এর উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি এ জেলার সবচেয়ে অবহেলিত উপকূলীয় জনপদ পেকুয়া ছিল সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত অনুগ্রহে ২০০২ সালের ২৭ এপ্রিল পেকুয়াকে প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে উন্নীত করা হয়। পেকুয়া ইউনিয়নের উপজেলায় রূপান্তর কক্সবাজারবাসীর জীবনে একটি বিরল ঐতিহাসিক ঘটনা। উপজেলা হওয়ার ফলে একদিকে যেমন পেকুয়ার অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে, কক্সবাজার জেলাও হয়েছে প্রথম শ্রেণির সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন জেলাসমূহের অন্যতম।
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এর মূল শহরকে যেমন বাইপাস রোডের মাধ্যমে দক্ষিণে সম্প্রসারিত করা হয়েছে তেমনি খুরুস্কুল ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে উত্তরাংশ সম্প্রসারণের সুযোগও সৃষ্টি করা হয়েছে। অপরদিকে খুরুস্কুলের সাথে উপকূলীয় এলাকা চকরিয়ার সংযোগের জন্য চৌফলদণ্ডী ব্রিজের কাজ শুরু করা হয়েছে। পরবর্তীতে উক্ত সড়ক ঈদগাঁও হয়ে মহাসড়কে সংযুক্ত হবে। এর ফলে উপকূলীয় জনগণের আয় বর্ধনকারী কর্মকাণ্ডসহ যাতায়াতের বিশাল সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হবে। কক্সবাজার-ঈদগাঁও-চট্টগ্রামের সড়কপথের দূরত্ব বহুলাংশে হ্রাস পাবে।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বিকল্প আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে যা আগামী ২০০৬ সালের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা। এ সড়কটি নির্মিত হলে মহেশখালী-কুতুবদিয়া-পেকুয়া-চকরিয়া-বাঁশখালী-আনোয়ারা-পটিয়াসহ সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। দুর্যোগকালীন সময়ে উদ্ধার তৎপরতাও ত্বরান্বিত হবে। লবণ, মাছ, ধান, পান-সুপারি, চিংড়িসহ সকল প্রকার পণ্যের বাজারজাতকরণ সহজতর হবে এবং উপকূলবাসী দ্রুত সমৃদ্ধি অর্জন করবে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের পূর্বমুখী নীতি আমাদের দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করেছে। কক্সবাজারের সীমান্ত ভৌগোলিকভাবে মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সাথে সরাসরি উপকূল-স্থল-টেকনাফ সীমান্ত দ্বারা সংযুক্ত। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সরকার ইতোমধ্যে একাধিক দৃশ্যমান কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রী পর্যায়ে সফর বিনিময় হয়েছে। সর্বশেষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ২০-২২ মার্চ সিঙ্গাপুর সফর করেছেন। আমাদের প্রকৌশল টিম মিয়ানমারে ও মিয়ানমার প্রকৌশল টিম বাংলাদেশে এসেছে। সংযোগ সড়কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে। খুব শীঘ্রই মিয়ানমারের সংযোগ সেতুও শুরু হওয়ার পথে। এ সীমান্ত যদি সংযুক্ত হয়, তাহলে কক্সবাজারই হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাবতীয় অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের একমাত্র সিঁড়িঘর। যার সুফল কক্সবাজারসহ সমগ্র জাতি ভোগ করবে।
উন্নয়নমুখী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের আর একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপের নাম- বৈশ্বিক পর্যায়ের যোগাযোগ প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণ, বর্তমানে যার জোয়ার চলছে সারাবিশ্বে। এ পদক্ষেপের সূচনা পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তির বাহন সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মিত হয়েছে এ কক্সবাজারেই। পাশাপাশি কক্সবাজার সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ৬০ একর জায়গা ইতোমধ্যে অধিগ্রহণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কক্সবাজারবাসী এসব প্রকল্পের গর্বিত অংশীদার।
বর্তমান সরকারের আমলে টেকনাফ স্থলবন্দর স্থাপন করা হয়েছে। যা থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হচ্ছে বার্ষিক ৮০ কোটি টাকা। কক্সবাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইতোমধ্যেই অনেকগুলো প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে রামু-গর্জনিয়া ব্রীজ, মহেশখালী-জলদাসখালী সড়ক, মহেশখালী-চকরিয়া ব্রীজ, একতাবাজার-পরষদার সড়ক ইত্যাদি অন্যতম। বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষির উন্নয়ন বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে সারা কক্সবাজারে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম এলজিইডি কর্তৃক ১৯৯৪ সালে বাঁকখালী নদীতে এবং কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও এলাকায় নির্মিত দুটি রাবার ড্যামের মাধ্যমে কয়েক হাজার হেক্টর জমিকে কৃষি চাষের আওতায় আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে রামু-উপজেলার জোয়ারিয়ানালা নির্মিত আরও একটি রাবার ড্যামের সাহায্যে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমি শস্য চাষের আওতায় এসেছে। বর্তমানে একই উপজেলার কচ্ছপিয়া আরও একটি রাবার ড্যাম নির্মাণাধীন রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম রাবার ড্যামটি স্থাপিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলার ভোলাখালী মাতামুহুরী সেচ প্রকল্পের একটি অংশ হিসেবে। অপর দুটি অংশের একটির আওতায় বাঁশখালিতে বাঁধের ও অপরটির আওতায় পলাকাটিতে রাবার ড্যাম নির্মিত হয়েছে। মাতামুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতাধীন এ তিনটি অংশ সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে ২০ হাজার হেক্টর জমি বোরো চাষের অন্তর্ভুক্ত হবে। এছাড়া এলজিইডি কর্তৃক চকরিয়ার খুটাখালীতে ও পেকুয়ার টইটং-এ দুটি রাবার ড্যাম নির্মাণাধীন রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে আরও তিন হাজার একর জমি বোরো চাষের আওতায় আসবে।
কক্সবাজার জেলায় পরিচালিত সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ইতিপূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত হরবাং সেচ প্রকল্পের আওতা বৃদ্ধির জন্যও উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে যা বাস্তবায়িত হলে আরও অধিক পরিমাণ এলাকা বোরো ও শস্য চাষের আওতায় আসবে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশের মধ্যে কেবল কক্সবাজার জেলাতেই এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা কৃষি ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি কক্সবাজারকে বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার-এ রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান ও অনুকরণীয় অবদান রেখে চলেছে।
সুতরাং বলছি, এ জেলার ভূগর্ভে ছড়িয়ে আছে বিপুল ঐশ্বর্যের সম্ভার। কক্সবাজারের বালুকাবেলায় ছড়িয়ে আছে জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট ও মনাজাইটসহ বহু মূল্যবান খনিজ পদার্থ। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও শিল্প-কারখানায় প্রাকৃতিক জ্বালানি সংকট নিরসনে এ সকল খনিজ পদার্থ অসামান্য অবদান রাখতে পারে। এ লক্ষ্য ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে সমুদ্রবর্তী এলাকায় পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। প্রাকৃতিক মূল্যবান সম্পদ উত্তোলন ও গবেষণায় এ কেন্দ্র নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
জাতীয় সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির পূর্বশর্ত হচ্ছে শান্তিপূর্ণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কক্সবাজারের ২০ লাখ জনগণ ৪টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৪টিতেই বিএনপিকে বিজয়ী করেছে, আমরা তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। এ কথা গর্বের সাথে বলা যায়, বিগত যে কোন সময়ের তুলনায় কক্সবাজারের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে অনেক উন্নত।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা পরবর্তী ৩০ বছর পর্যন্ত কক্সবাজারের উন্নয়ন ছিল চট্টগ্রামের নেতৃত্ব নির্ভর। কিন্তু আজ সে পরিবেশ আর নেই। কক্সবাজারবাসী আজ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। এ কথা হলফ করে বলতে পারি, স্বল্প জনপ্রিয়তা লাভের আশায় আমরা কোন কাজ করিনি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে অজনপ্রিয় ও কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, উন্নয়ন কার্যক্রম হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার লক্ষ্যে, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুফল ভোগ করতে পারে। সে লক্ষ্য অর্জনে আমাদের ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে। অমিত সম্ভাবনার বেলাভূমি কক্সবাজারের সকল প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথভাবে উত্তোলন ও ব্যবহার করতে হবে। পর্যটনের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংযোগ সড়ক ও গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন করতে হবে। কেবল তাহলেই এ নগরীর বাতাসে উড়ে ডলার, আর পানিতে ভাসে তরল সোনা—এ কথা যথার্থ প্রমাণিত হবে।
সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল নয়, আসুন আমরা সকলেই সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাই, যার লক্ষ্য হবে ‘সমৃদ্ধ কক্সবাজার, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’।


লেখক: সালাহউদ্দিন আহমদ, এমপি, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
নিবন্ধটি ২০০৫ সালে বিএনপি কক্সবাজার জেলা শাখা কর্তৃক প্রকাশিত ‘সমৃদ্ধ কক্সবাজার’ ম্যাগাজিন থেকে সংগৃহীত।