দেলোয়ার হোসাইন
প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে চাই—ইতিহাস কী?
ইতিহাস হলো পূর্ববর্তী প্রজন্মের কর্ম, ত্যাগ ও অর্জনকে যথাযথভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।
ভালুকিয়া পালং উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে, মরহুম যোগেন্দ্রলাল শিকদারের মহতি উদ্যোগে। তিনি তাঁর মূল্যবান জমি দান করে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণের মাধ্যমে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেন। যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই একটি ঘূর্ণিঝড়ে সেই ঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবুও তাঁর এই ত্যাগ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পরবর্তীতে এলাকার একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ ও সম্মানিত ব্যক্তি—রশিদ মাস্টার, মোঃ হাসেম, রফিক সওদাগর, মোক্তার আহমদ মাস্টার, শুক্কুর মাস্টার, আরশাদ আলী সিকদার, বাবু অরবিন্দু বড়ুয়া, মোঃ আলী মেম্বারসহ আরও অনেকে—অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস চালিয়ে যান। তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ মাহমুদুল হক চৌধুরী এক অনন্য ও ইতিহাস গড়ার মতো ভূমিকা রাখেন। তিনি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ১ লক্ষ টাকার সরকারি বরাদ্দ প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা ব্যয় করে একটি টিনশেড ভবন নির্মাণ করেন, যা বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ভিত্তিকে দৃঢ় করে তোলে।
এরপর তিনি কক্সবাজারের ইলিয়াস মিয়া চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক কিরণ বড়ুয়াকে এনে ভালুকিয়া পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৮৮ সালে বিদ্যালয়টির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—নিবন্ধনের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করে শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য খরচ বহন করেন। এটি নিঃসন্দেহে একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী, দায়িত্বশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের বিরল দৃষ্টান্ত।
আজকের এই ঈদ পুনর্মিলনী ও গুণীজন সম্মাননা অনুষ্ঠানে অতীতের এই গৌরবময় ইতিহাস স্মরণ করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে যাঁর অবদান অপরিসীম—আলহাজ মাহমুদুল হক চৌধুরী—তাঁকে যদি আজকের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মানিত করা হতো, তবে নিঃসন্দেহে অনুষ্ঠানটি আরও অর্থবহ, সমৃদ্ধ ও পূর্ণতা পেত।
তবে এটাও সত্য—মহৎ মানুষের অবদান কোনো স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকে না। বরং তিনি নিজেই বলেন,
“এই প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
ভালুকিয়া পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কাহিনি নয়;
এটি ত্যাগ, দায়বদ্ধতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আসুন, আমরা সকলেই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আমাদের এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাই।
নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরি এই গৌরবময় ইতিহাস, যাতে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে এগিয়ে আসে।
পরিশেষে, মহান আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা—তিনি যেন এই প্রতিষ্ঠানকে উন্নতি, সমৃদ্ধি ও সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
লেখক : সহকারী রেজিস্ট্রার (৬ষ্ঠ গ্রেড) , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় , চট্টগ্রাম।
