– আকতার চৌধুরী

আমরা দুই ভাইবোন—বোন বড়। আমার মাত্র ১০ মাস বয়সে পিতৃহারা হই। বড় হই দাদার আশ্রয়ে। একদিন দাদা লক্ষ্য করলেন, গ্রামের অন্য ছেলেদের মতো আমিও গালাগালি শিখে গেছি, কখনো খেলার ফাঁকে মারামারিও করছি। সেই দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, “একে আর গ্রামে রাখা যাবে না।”
তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন-আমাকে শহরে পাঠাবেন।

বড়বোনকে আগেই কক্সবাজার গার্লস হাই স্কুলে পড়তেন। আমি-ও প্রাথমিক শেষ করে গ্রাম ছাড়লাম—চলে এলাম কক্সবাজার শহরে, ভর্তি হলাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। শহুরে আবহে কিছুটা বদলে গেলাম, কিছুটা ভদ্র, কিছুটা সচেতনও হলাম।

একদিন রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছি। শেয়ারিং রিকসা । একজন আট আনা। গন্তব্য চৌধুরী ভবন থেকে বাজারঘাটা। সিকদার মহলের কাছে এসে দেখি—আমাদের গ্রামের এক স্যার হাঁটছেন। আমি বিন্দুমাত্র দেরি না করে চলন্ত রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নামলাম—প্রায় স্যারের পায়ের কাছে গিয়ে পড়লাম!
স্যার অবাক, কিছুটা রাগও করলেন—“এভাবে লাফ দেয় কেউ?”
আমি মাথা নিচু করে পায়ের কাছে হাত রাখলাম।
সেদিন মনে হয়েছিল—স্যার হেঁটে যাচ্ছেন, আর আমি রিকশায় বসে যাচ্ছি-এ যেন এক অমার্জনীয় বেয়াদবি!

একদিন গ্রামে গেছি। শুনে গ্রামের এক ফুফু দৌড়ে এলেন সৌদি প্রবাসী স্বামীর চিঠি নিয়ে—আমাকে সেটা পড়ে দিতে হবে। পড়াশোনা জানা লোক তখন গ্রামে দুর্লভ। আমি চিঠি পড়ে শোনালাম, তিনি হাসলেন, কেঁদেও ফেললেন। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—আমি যেন এক ‘মাস্টার সাহেব’ হয়ে গেছি!

১৯৭৯-৮০ সালের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান গ্রামে গ্রামে ‘নাইট স্কুল’ চালু করেন—নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য। আমাদের কাচারিঘরে সন্ধ্যা হলে জড়ো হতেন গ্রামের মা-খালা-দাদিরা। তাদের অ, আ, ক, খ শেখাতাম। কারো কারো স্বপ্ন ছিল শুধু নিজের নামটা লিখতে পারা। আজও মনে পড়ে, যখন কেউ প্রথমবার নিজের নামটা লিখে হাসিমুখে বলতেন—“দেখছ মাস্টার, আমি পারছি”—তখন বুকের ভেতর কী এক অদ্ভুত আনন্দ হতো!

সম্ভবত এইসব অভিজ্ঞতাই আমার ভেতরে শিক্ষকতার বীজ রোপণ করেছিল।

প্রথম জীবনে কর্পোরেট চাকরি করেছি, ব্যবসাও করেছি। কিন্তু কোথাও যেন স্থির হতে পারিনি। অবশেষে ১৯৯৮ সালে যোগ দিলাম কক্সবাজার সিটি কলেজে। আজ ২৮ বছর কেটে গেছে—অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও রয়েছে হাজারো শিক্ষার্থীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আর এক অমূল্য সামাজিক মর্যাদা।

তবু আজ, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে, এক গভীর শঙ্কা আমাকে ঘিরে ধরে—
আমাদের সেকালের মতো সেই শ্রদ্ধা আজ বড়োই বিরল হয়ে গেছে।
হয়তো আমরা দিতে পারছি না, নয়তো তারা নিতে জানছে না।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে যে উষ্ণ সম্পর্ক, তা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে—ডিজিটাল আলোয়, ব্যস্ততার অন্ধকারে।

তবু আমি বিশ্বাস করি—
শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষ গড়ার দায়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব।
একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ ও স্বপ্নকে পথ দেখান।
সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পদ্ধতি বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, বদলাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগের ধরনও। কিন্তু শ্রদ্ধা, মানবিকতা ও পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
আমরা যেন এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ তৈরি করতে পারি, যেখানে শিক্ষার্থী শিক্ষককে শুধু জ্ঞানদাতা হিসেবে নয়—জীবনের একজন আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখতে শেখে।
কারণ একজন ভালো শিক্ষক হয়তো জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর দেন না,
কিন্তু তিনি এমনভাবে ভাবতে শেখান—
যাতে শিক্ষার্থী একদিন নিজের উত্তর নিজেই খুঁজে নিতে পারে।

লেখক : অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) , কক্সবাজার সিটি কলেজ