তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট এখন তথ্য খোঁজা, লেখালেখি, কোডিং কিংবা বিভিন্ন বিষয় বোঝার কাজে নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত, সংবেদনশীল বা পেশাগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চ্যাটবটের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে আইনি ও চিকিৎসা পরামর্শ, মানসিক সহায়তা, কর্মক্ষেত্রের গোপন নথি এবং পাসওয়ার্ড বা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

প্রযুক্তিবিষয়ক গণমাধ্যম এনগ্যাজেটের এক প্রতিবেদনে চ্যাটজিপিটি বা অন্য কোনো এআই চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের কাজ বা তথ্য এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আইনি পরামর্শের জন্য নয়
চ্যাটজিপিটির দেওয়া আইনি তথ্য সব সময় নির্ভুল না-ও হতে পারে। বিশেষ করে আদালতের মামলা, আইনি নথি বা নির্দিষ্ট কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই না করে ব্যবহার করলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনটিতে আইন ও তথ্যবিজ্ঞান গবেষক ড্যামিয়েন শার্লো তার একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে বিশ্বজুড়ে দুই হাজারের বেশি আদালতের এমন সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত হয়েছে; যেখানে চ্যাটজিপিটির তৈরি ভুয়া আদালতের রায়, উদ্ধৃতি বা যুক্তি ধরা পড়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী মামলাকারীদের পাশাপাশি আইনজীবীদের ঘটনাও আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি কোনো আইনজীবীর বিকল্প নয়। সাধারণ কোনো আইনি ধারণা বোঝার জন্য এটি ব্যবহার করা গেলেও নিজের চলমান মামলা বা বিরোধের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে আইনি পরামর্শ নেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাদার আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের বিকল্প হিসেবে নয়
মানসিক সংকট, আত্মহত্যার চিন্তা, মানসিক অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতার মতো বিষয়ে চ্যাটবটকে থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারীদের একটি অংশের কথোপকথনে আত্মহত্যার পরিকল্পনার সম্ভাব্য লক্ষণ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কিছু ব্যবহারকারীর মধ্যে মনোবৈকল্য বা অতিরিক্ত উন্মত্ততার লক্ষণও দেখা যায়। এআই চ্যাটবট অনেক সময় ব্যবহারকারীর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ না করে তার সঙ্গে একমত হওয়ার প্রবণতা দেখাতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তি নিজের ভুল ধারণা বা বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস নিয়ে চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বললে, সেটি কখনো কখনো সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে গুরুতর মানসিক সংকট বা চিকিৎসার প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া উচিত।

কর্মক্ষেত্রের গোপন তথ্য দেবেন না
কোনো প্রতিষ্ঠানের গোপন নথি, অভ্যন্তরীণ তথ্য, গ্রাহকের তথ্য, সোর্স কোড বা গোপনীয় চুক্তির তথ্য ব্যক্তিগত চ্যাটবটে দেওয়া উচিত নয়। প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মধু গোত্তুমুক্কালার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ‘অফিশিয়াল ইউজ অনলি’ হিসেবে চিহ্নিত কয়েকটি নথি চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এ ঘটনায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি এবং তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া স্যামসাং ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানের ডিভাইসে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। কারণ কয়েকজন প্রকৌশলী অভ্যন্তরীণ সোর্স কোড চ্যাটজিপিটিতে দিয়ে ফেলেছিলেন। তাই অফিসের গোপন নথি, গ্রাহকের তথ্য, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য বা গোপনীয়তার আওতাভুক্ত কোনো উপাদান ব্যক্তিগত এআই চ্যাটবটে দেওয়া উচিত নয়।

চিকিৎসা পরামর্শের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন
শরীরের কোনো সমস্যা, ওষুধ, রোগের চিকিৎসা কিংবা গুরুতর স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য-গোপনীয়তা আইন এইচআইপিএএর সুরক্ষা চিকিৎসক, বিমা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও চ্যাটজিপিটিতে দেওয়া তথ্য একই ধরনের আইনি সুরক্ষা পায় না। প্রতিবেদনটিতে আরও একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এক ব্যক্তি খাবার থেকে ক্লোরাইড কমানোর উপায় জানতে চ্যাটবটের পরামর্শ নিয়ে সোডিয়াম ব্রোমাইডকে খাবার লবণের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এ ধরনের ঘটনা দেখায়, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো তথ্য বা পরামর্শের ক্ষেত্রে এআইয়ের উত্তরকে চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

এআই কি সত্যিই মানুষের কাজ কেড়ে নিচ্ছে?
পাসওয়ার্ড, পরিচয়পত্রের নম্বর ও ব্যাংক তথ্য দেবেন না
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গাগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তথ্য। পাসওয়ার্ড, একবার ব্যবহারের লগইন কোড, পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাংক হিসাবের পূর্ণ বিবরণ, কার্ডের তথ্য কিংবা পরিচয়পত্রের ছবি চ্যাটজিপিটির মতো কোনো চ্যাটবটে দেওয়া উচিত নয়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, অতীতে হাজার হাজার চ্যাটজিপিটি কথোপকথন গুগল সার্চের ফলাফলে দেখা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ চ্যাট শেয়ার করার সময় সেটিকে সবার জন্য খুঁজে পাওয়ার মতো করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ার কারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চ্যাটের তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে কোনো চ্যাটবটকে ব্যক্তিগত তথ্যের সম্পূর্ণ নিরাপদ ভল্ট হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে পাসওয়ার্ড, একবার ব্যবহারের কোড, পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর এবং ব্যাংক বা কার্ডের পূর্ণ তথ্য কখনোই চ্যাটে না দেওয়াই নিরাপদ।

তাহলে চ্যাটজিপিটি কী কাজে ব্যবহার করবেন?
চ্যাটজিপিটি বা অন্য এআই চ্যাটবট তথ্য খোঁজা, সাধারণ ধারণা বোঝা, লেখার খসড়া তৈরি, কোডিংসহ নানা কাজে সহায়ক হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এআইয়ের উত্তর যাচাই করা জরুরি। মূল বিষয় হলো, এআইকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আইনজীবী, চিকিৎসক, থেরাপিস্ট বা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়।