নিজস্ব প্রতিবেদক:
কক্সবাজার সদরের ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন প্রায় ১০ মাস ধরে পলাতক। তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়নি এখনো। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এই সুযোগে অবৈধ রেজুলেশন তৈরী ও তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজম সাহাব উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বানানোর নীল নকশা করেছে একটি চক্র। তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে মোটা অংক ব্যয় করেছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, জনভোগান্তি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচনে জটিলতার অন্যতম কারণ সাহাব উদ্দিন মেম্বার। তিনি পলাতক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন এর ডানহাত হিসেবে পরিচিত। ইউনিয়ন পরিষদের সিদ্ধান্তের নামে নথিপত্র জালিয়াতির কারণে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচন।
আওয়ামী লীগ নেতা আজম সাহাব উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব না দিতে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল অধিকাংশই ইউপি সদস্যের স্বাক্ষরে জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন দেওয়া হয়। যেখানে সুপারিশ করেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মাবুদ এবং সদর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির খুরশিদ আলম আনসারী। এরপরও গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগের এই নেতাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বানানোর মিশন অব্যাহত রেখেছে স্বৈরাচারের একটি চক্র।
এদিকে, ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান-১ ও প্যানেল চেয়ারম্যান-২ সংক্ৰান্ত সঠিক তথ্য যাচাইপূৰ্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্ৰহণের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন দেন ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. ফজলুল হক।
১৯ আগস্ট ১৫১২৬ স্মারকে আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অনুপস্থিত/পলাতক থাকায় পরিযদের ১০ জন সদস্যের স্বাক্ষরে তাকে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ হিসেবে ভারগ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্ৰদানের জন্য আবেদন করা হয়।
ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে মেম্বার শাহাব উদ্দিন মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১৬১৮৪/২০২৫ দায়ের করেন। রিটের প্রেক্ষিতে জেলা প্ৰশাসকের কাৰ্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখা হতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট দফাওয়ারি জবাব ও প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে প্ৰতিবেদন চাওয়া হয়। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর তাঁর দফাওয়ারি জবাব দেন। তিনি ৭নং অনুচ্ছেদে মতামত প্ৰদান করেন যে, জনস্বার্থ রক্ষা ও নিশ্চিত করার লক্ষ্য ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোঃ ফজলুল হকের নিকট আৰ্থিক ও প্ৰশাসনিক ক্ষমতা হত্তান্তর করা যেতে পারে।
পরবতীতে ভারুয়াখালী ইউনিয়নের প্রশাসক বদলী হয়ে যাওয়ায় নতুন করে শাহাব উদ্দিন নিজেকে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ দাবি করে প্যানেল চেয়ারম্যান-১, ২ ও ৩ কে প্ৰশাসনিক ক্ষমতার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
উল্লেখ্য, শাহাব উদ্দিন বিগত ২৩/০৯/২০২৫ জেলা প্রশাসক বরাবর দাখিলকৃত আবেদনে দাবি করেন য়ে, ২৭/১০/২০২২ ইং তারিখে ইউনিয়ন পরিষদের একটি বিশেষ সভায় তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান-১ নির্বাচিত হন। অথচ তাঁর মহামান্য হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিট পিটিশনের ২৩নং পৃষ্ঠার আবেদনে এবং ৩৩নং পৃষ্ঠায় সংযুক্ত অপর আবেদনে তিনি দাবি করেন যে ইউনিয়ন পরিষদের প্ৰথম সভাতেই তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান-১ নির্বাচিত হন এবং এর সমর্থনে প্রথম সভার কার্যবিবরণী সংযুক্ত করেন।
অৰ্থাৎ, একই বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন আবেদনে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ নির্বাচনের তারিখ ও সভা সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার অফিস থেকে ১৮/o৮/২০২৬ ইং তারিখের ০৫.২০.২২০০.২২২৪.০১.০১.২৬-৮৬০ স্বারকমূলে জেলা প্রশাসকের নিকট মতামতসহ প্ৰতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে ফিরোজ আহমদকে প্যানেল চেয়ারন্যান-২ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ১৮/ο৮/২০২৬ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্যকে নিয়ে অনুষ্ঠিত
সভায় ফিরোজ আহমদ প্ৰকাশ্যে জানান যে, ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদে এ ধরনের কোনো প্যানেল চেয়ারম্যান গঠিত হয়নি।
তিনি কখনো প্যানেল চেযমারমন্যান-২ পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেননি এবং নির্বাচিত হননি। তিনি আরও জানান, প্যানেল চেয়ারম্যান গঠন সংক্রান্ত কোনো সভায় তিনি অংশগ্ৰহণে করেননি। সভায় তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান-১ এর বিপক্ষে স্বাক্ষর করেন।
ফলে তার বক্তব্যের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ১৮/০৮/২০২৬ ইং তারিখের প্ৰতিবেদনে ফিরোজ আহমদকে প্যানেল চেয়ারম্যান-২ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি সরাসরি সাংঘর্ষিক। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের বিধি মোতাবেক ৩ সদস্য নিয়েই প্যানেল গঠন করতে হয়।
মো. ফজলুল হক মেম্বার তার আবেদনে আরো উল্লেখ করেন, ফিরোজ আহমদ কর্তৃক খালি রেজুলেশন খাতায় স্বাক্ষর গ্ৰহণ করা হয়েছিল যা পরবর্তীতে প্যানেল চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর হিসেবে দেখানো হয়। এই জালিয়াতির বিষয়ে তিনি বিগত ১৮/০৮/২০২৬ ইং তারিখ লিখিতভাবে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন।
বিগত ১৮/১২/২০২২ ইং তারিখের ০৫.২০.২২২৪,০০০.০০,০০০,২০২২. ১১১০ নং স্মারকে তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাকারিয়া খালি রেজুলেশন খাতায় স্বাক্ষর সম্বলিত কাগজপত্রাদি জব্দ করে তাঁর অফিসে নিয়ে যান।
এমতাবস্থায়, প্যানেল চেয়ারম্যান-১ ও প্যানেল চেয়ারম্যান-২ সংক্ৰান্ত বিষয়ে বিভিন্ন নথি, সভার কার্যবিবরণী, উপস্থিতি, স্বাক্ষর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ অসঙ্গতি দেখা গিয়েছে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজন ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
সেই সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য ও রেজুলেশন জালিয়াতির বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ উদঘাটন করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইউপি সদস্যবৃন্দ।
