তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতোমধ্যে ১০০ দিন পূর্ণ করেছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন খাতে নেওয়া উদ্যোগ ও দৃশ্যমান অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জনকল্যাণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

সোমবার (২৫ মে) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উপ-প্রেসসচিব জাহিদুল ইসলাম রনি।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ

নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া নিম্নআয়ের ৫৫ লাখ পরিবারের জন্য ১৫ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সরকার ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর উদ্যোগও নিয়েছে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি

ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ‘কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশেষ পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

শ্রমিক ও কর্মসংস্থান

ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস নিশ্চিতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থনৈতিক তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।

বন্ধ কলকারখানা চালু, প্রতিটি জেলায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ স্থাপন এবং প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।

শিক্ষা ও তরুণ উন্নয়ন

মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি মেধাভিত্তিক বৃত্তি সম্প্রসারণ, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া মিড-ডে মিল চালু, স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর কথাও জানানো হয়।

স্বাস্থ্য ও মানবিক উদ্যোগ

সরকার জানিয়েছে, হামের টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় শতভাগ শিশুকে আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অব্যবহৃত সরকারি ভবনে মাতৃসদন ও ক্লিনিক চালুর পরিকল্পনার পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে আহতদের বিদেশে চিকিৎসা সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

ঈদযাত্রা ও হজ ব্যবস্থাপনা

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ট্রেন ও নৌ-সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য ট্রেনে আলাদা কম্পার্টমেন্ট রাখার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।

এছাড়া কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সাধারণ হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।

অর্থনীতি ও প্রবাসী কল্যাণ

সরকারের দাবি, রেমিট্যান্স বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রফতানি আয় বৃদ্ধির তথ্যও তুলে ধরা হয়।

গণতন্ত্র, সংসদ ও প্রশাসন

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ১০টি কেবিনেট সভায় ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়।

এছাড়া সংসদে রেকর্ড ৯৪টি বিল পাস এবং দ্রুত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি জনসম্পৃক্ততা ও গণশুনানি কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করা হয়।

অবকাঠামো ও প্রযুক্তি

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ইকোনমিক করিডোর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে বলেও জানানো হয়।

বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই, এআই প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন ঢাকা’ মহাপরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর পরিকল্পনার তথ্য জানানো হয়।

পরিবেশ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি

আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে কয়েক হাজার বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন এবং মেট্রোরেলের নিচে সবুজায়নের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

খেলাধুলা ও সংস্কৃতি

‘ক্রীড়া কার্ড’ চালু এবং দেশব্যাপী স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্কুল ও ক্লাবে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগও তুলে ধরা হয়।

এছাড়া ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা এবং তরুণদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে নতুন কর্মসূচি নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।