রক্তের অঙ্গীকার থেকে বিনিয়োগের রাজনীতি—বাংলাদেশের সংসদের অনুসন্ধানী কাহিনি (১৯৭১–২০২৬)

হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান :

১৯৭১: স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর জন্ম নিল নতুন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহর, শূন্য গ্রাম এবং নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়েছিল এক মৌলিক অঙ্গীকার: শাসন হবে জনগণের, সিদ্ধান্ত হবে জনগণের পক্ষে।

ঔপনিবেশিক শাসন, সামরিক দমন ও বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাস ভেঙে প্রতিষ্ঠিত হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার উৎস ভোট, বন্দুক নয়। এই স্বপ্নের প্রতিফলন ছিল জাতীয় সংসদ—একটি আইনসভা, যেখানে নীতি নির্ধারণ হবে বিতর্কের মাধ্যমে, যেখানে সরকার জবাবদিহির আওতায় থাকবে, আর যেখানে বিরোধী কণ্ঠকে দমন করা হবে না বরং রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে।

সংসদকে ভাবা হয়েছিল রাষ্ট্রের নৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে—একটি উন্মুক্ত মঞ্চ যেখানে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুর অধিকার, নারীর মর্যাদা, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে তর্ক হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জন্ম নিত আইন, সমঝোতা এবং নৈতিক দায়িত্বের ভিত্তি।

কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে বাস্তবতার আয়নায় ছবি জটিল। সংসদ টিকে আছে, নির্বাচন হয়েছে, সরকার গঠিত হয়েছে—তবু প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। দলীয় নিয়ন্ত্রণ, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা, নির্বাচনী বিতর্ক, বিরোধী কণ্ঠের সংকোচন এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে গভীর সংশয় জন্ম দিয়েছে।

সংবিধানের অঙ্গীকার ও সীমাবদ্ধতা

১৯৭২ সালের সংবিধান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর উচ্চাভিলাষী ভিত্তি স্থাপন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে নির্মিত সংবিধান সংসদীয় শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল—যেখানে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে এবং নির্বাহী বিভাগ সংসদের কাছে জবাবদিহি দেবে।

কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। এটি সংসদ সদস্যদের দলীয় হুইপের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। বাস্তবে, সদস্যরা স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা বা নৈতিক অবস্থান অনুযায়ী ভোট দিতে পারলেও, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সাংসদ পদ হারানোর ঝুঁকি থাকে। ফলে, সংসদে বিতর্ক থাকলেও ভোটাভুটি প্রায় পূর্বনির্ধারিত হয়ে যায়।

ফলে, সংসদীয় ব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি—বিতর্কের মাধ্যমে মতগঠন—ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা চ্যালেঞ্জ করার স্বাধীনতা থাকলে গণতন্ত্রের প্রাণ ঠিক থাকে। যখন আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় দলীয় হুইপের বাইরে স্বাধীন অবস্থান নেওয়া অসম্ভব হয়, তখন সংসদ ধীরে ধীরে অনুমোদনের মঞ্চে পরিণত হয়।

১৯৭৫: কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও ছিন্ন গণতন্ত্র

অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ রাষ্ট্রকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং সংসদীয় বিতর্ক কার্যত স্থগিত হয়; ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় নির্বাহী কাঠামোর ভেতরে।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫—রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার আকস্মিক ছেদ। এর পর সামরিক শক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালিত হয়। সংসদ তখন আর গণতান্ত্রিক বিতর্কের কেন্দ্র ছিল না; বরং ক্ষমতার রূপান্তরের প্রতীক। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো টিকে থাকলেও গণতন্ত্রের প্রাণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

সামরিক ছায়া ও প্রশ্নবিদ্ধ বৈধতা (১৯৭৫–১৯৯০)

১৯৭৫–১৯৯০ সালের সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সামরিক প্রভাব। নির্বাচন হয়েছে, সংসদ বসেছে, আইন পাস হয়েছে—কিন্তু নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, প্রতিযোগিতার সমতা এবং জনসমর্থনের প্রকৃততা নিয়ে দ্বৈততা দেখা দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত ছিল, বিরোধী মতের পরিসর সীমিত, সংবাদমাধ্যম চাপের মধ্যে।

ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তা কি সত্যিই জনমতের প্রতিফলন ছিল? দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়—সংসদ কার্যকরভাবে অস্তিত্বে থাকলেও নৈতিক ভিত্তি দুর্বল। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাইরে, সংসদে কেবল আনুষ্ঠানিকতা।

১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাবর্তন ও বিভাজন

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান সামরিক শাসনের অবসান ঘটায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধানিক ধারাবাহিকতা ফিরে আসে, সংসদ আবার রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

কিন্তু ১৯৯৪–১৯৯৬ সালে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন নতুন দ্বন্দ্বের উদ্রেক করে। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ফলে সংসদীয় বিতর্ক রাস্তায় চলে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কার্যকর বিরোধিতা না থাকায় নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা থেকে একদলীয় বাস্তবতা

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জন্ম নেয় আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে। প্রশাসন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা পুনরায় তৈরি করাই এর লক্ষ্য। কিন্তু এই ব্যবস্থার প্রবর্তন সংসদকে কার্যকর গণতন্ত্রের মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং দলীয় হুইপ সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে, স্বাধীন মত প্রকাশ এবং কার্যকর বিরোধিতা সংকুচিত হয়। এখানে রাষ্ট্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, আর সংসদ একদলীয় বাস্তবতার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনদাতা হয়ে ওঠে।

উন্নয়নের ভাষ্য বনাম জবাবদিহি

রাজ্যের দৃশ্যমান উন্নয়ন—সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেগা অবকাঠামো—সামাজিক কল্পনায় শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু গণতন্ত্রে উন্নয়ন একমাত্র ভিত্তি নয়।

• সংসদে কার্যকর বিরোধী কণ্ঠ না থাকলে,

• প্রশ্নোত্তর পর্ব আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমিত থাকলে,

• কমিটির সুপারিশ প্রাধান্য না পেলে,

উন্নয়ন হয় দৃশ্যমান, কিন্তু স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি ম্লান হয়। জনগণ প্রশ্ন করে—এই উন্নয়নের প্রকল্প কি সত্যিই জনকল্যাণে প্রতিফলিত হচ্ছে, নাকি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন দিয়ে চালানো হচ্ছে?

বিনিয়োগের রাজনীতি

নির্বাচন ব্যয়বহুল, দলীয় নিয়ন্ত্রণ কঠোর, স্বাধীন ভোট সীমিত—যে পরিস্থিতিতে সংসদ আসন অর্জন করা হয়, সেখানে এটি নৈতিক বা রাজনৈতিক দায়িত্বের চেয়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

রাজনীতিতে “উত্তোলন, কমিশন, প্রভাব, ব্যবসায়িক সুবিধা”—এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় সংসদীয় আসন কখনও কখনও বিনিয়োগের মাধ্যম হয়ে ওঠে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং দলীয় হুইপ একমাত্র সিদ্ধান্তের মানদণ্ড।

ক্ষমতার বলয় ও কাঠামোগত দুর্বলতা

সংসদ সদস্যের ক্ষমতা শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমিত নয়। প্রকল্প অনুমোদন, সরকারি তহবিল বরাদ্দে সুপারিশ, প্রশাসনিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি শক্তিশালী বলয়।

সমস্যা ব্যক্তির নয়, এটি কাঠামোর। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, দলীয় হুইপ, অর্থনৈতিক অবকাঠামো—এসব মিলে এমন পরিবেশ তৈরি করে যেখানে সদস্যের স্বাধীনতা সীমিত, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। সংসদে কার্যকর বিরোধী কণ্ঠ না থাকলে, কমিটি সুপারিশ কার্যকর না হলে, ভোট স্বাধীন না হলে—সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রকৃত গণতন্ত্র নির্দেশ করে না। বরং এটি স্থিতিশীল, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার কাঠামোকে নির্দেশ করে।

নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন (২০২৪–২০২৬)

ডিজিটাল প্রজন্ম সংসদের কার্যক্রমে নজর রাখছে। তারা প্রশ্ন তুলছে:

• সম্পদের উৎস কি স্বচ্ছ?

• আইন প্রণয়নের আগে জনমত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি?

• দলীয় হুইপের বাইরে বিবেকভিত্তিক ভোটের স্বাধীনতা আছে কি?

এই প্রশ্নগুলোই গণতন্ত্রের প্রাণ।

জাতীয় সংসদ নাকি পাশার আসর?

পাশার নিয়ম সহজ: ঝুঁকি নাও, জিতলে বহুগুণে ফেরত পাও। রাজনীতিতেও যদি সংসদীয় আসন হয়ে ওঠে আর্থিক বিনিয়োগের মাধ্যম, ক্ষমতা ও প্রশাসনিক প্রভাবের জটিল সমন্বয়—তাহলে গণতন্ত্রের মঞ্চ নয়, বরং লাভের খেলা।

সংসদ কেবল সংখ্যা অনুযায়ী টিকে থাকে, কিন্তু তার প্রাণশক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত। জনগণের কণ্ঠ, নৈতিক দায়িত্ব, জবাবদিহি—এগুলো সবই ক্ষয়প্রাপ্ত।

ইতিহাসের সামনে প্রশ্ন

সব সংসদ সদস্যকে দুর্নীতিগ্রস্ত ধরা অন্যায়। অনেক জনপ্রতিনিধি সততা, নিষ্ঠা এবং জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কাঠামোর দুর্বলতা—নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, কঠোর দলীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল জবাবদিহি—সংসদকে “পাশার আসর” হিসেবে প্রভাবিত করে।

গণতন্ত্র টিকে থাকে তিনটি শক্তির উপর:

• শক্তিশালী বিরোধী দল

• স্বাধীন ও সক্রিয় গণমাধ্যম

• কার্যকর জবাবদিহি

এই তিনটি স্তম্ভ দুর্বল হলে, সংসদ নামমাত্র গণতন্ত্রের মঞ্চ হয়ে থাকে। ভোট হয় আনুষ্ঠানিকতা, সিদ্ধান্ত হয় সংখ্যার খেলা, ক্ষমতা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের যন্ত্র।

১৯৭১ সালের স্বপ্ন—স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ সংসদ—

এখনো নিঃশেষ হয়নি,

তবে পূর্ণও হয়নি।

প্রশ্নটি তাই ইতিহাসের বুকেই রয়ে গেছে—

জাতীয় সংসদ কি সত্যিই জনগণের কণ্ঠস্বর, নাকি সংখ্যার টেবিলে সাজানো, নিয়ন্ত্রিত, আর্থিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের “পাশার আসর”?


লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান

coinbangla@gmail.com

২২শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬ই; রবিবার