খালেদ মোর্শেদ
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ হজ ও উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। ধর্মীয়ভাবে হজ মুসলমানদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। একই সঙ্গে এটি একটি বৃহৎ ব্যবস্থাপনাগত কার্যক্রম, যেখানে যুক্ত থাকে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি হজ এজেন্সি এবং স্বয়ং হজ বা উমরাহ যাত্রীরা। ফলে এই ইবাদতের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন শুধু ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনস্বার্থ, ভোক্তা অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নও গভীরভাবে জড়িত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হজ ও উমরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত ভোগান্তি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসছে। অপ্রস্তুতি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, আবাসন ও পরিবহনে অসঙ্গতি, খাবারের মানহীনতা, ফ্লাইট পরিবর্তন, এমনকি মদিনা থেকে ফিরতি যাত্রায় জেদ্দা পর্যন্ত দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বাসযাত্রার মতো বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের জন্য চরম শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে—এই ব্যর্থতার দায় কোথায় এবং কার?
হজ ইসলামের পাঁচটি ফরজ ইবাদতের একটি, যা একজন সক্ষম মুসলমানের জীবনে অন্তত একবার পালন করা আবশ্যক। উমরাহ ফরজ না হলেও এর রয়েছে গভীর আত্মিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ পবিত্র মক্কা ও মদিনায় এই ইবাদত পালনে অংশ নেন। এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের বিশ্বাস, দেশের ভাবমূর্তি এবং বিপুল অর্থনৈতিক লেনদেন। অথচ বাস্তবতা হলো—এই পবিত্র ইবাদত অনেক সময় অব্যবস্থাপনা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও তথ্য গোপনের কারণে কষ্টকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হচ্ছে।
হজযাত্রীর দায়িত্ব: সচেতনতা ছাড়া প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ
হজ বা উমরাহ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে শুধু টিকিট কাটা বা এজেন্ট বাছাই করা নয়। এটি একটি শারীরিকভাবে কষ্টসাধ্য এবং মানসিকভাবে ধৈর্যের ইবাদত। তাই প্রত্যেক হজযাত্রীর দায়িত্ব হলো যথাযথ ধর্মীয় ও বাস্তব প্রস্তুতি গ্রহণ করা। হজযাত্রীদের উচিত হজ ও উমরাহর নিয়মকানুন সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান অর্জন করা, নিজের শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করা এবং সরকারি নিবন্ধন ও তথ্যব্যবস্থা নিয়মিত অনুসরণ করা। একই সঙ্গে পবিত্র ভূমিতে শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে নতুন হজযাত্রীদের জন্য একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- হজ এজেন্ট নির্বাচন করার আগে সংশ্লিষ্ট এজেন্টের বাস্তব কার্যক্রম ও সুনাম সম্পর্কে জানা। শুধু বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত পরিচিতি বা মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করলে এই পবিত্র যাত্রা ভোগান্তিতে রূপ নিতে পারে। মক্কা ও মদিনার হোটেল হারাম শরিফ থেকে কত দূরে, হাঁটার পথ নাকি বাসনির্ভর-এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেওয়া জরুরি। হোটেলের আশপাশের পরিবেশ, যাতায়াতের রাস্তা, খাবারের মান, লিফটসহ অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে আগেভাগে জানা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আগে হজ বা উমরাহ পালন করেছেন এমন আত্মীয়, পরিচিত বা সহকর্মীদের কাছ থেকে ভালো ও খারাপ উভয় অভিজ্ঞতা শোনা। বাস্তব অভিজ্ঞতাই এজেন্ট নির্বাচনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গাইড।
একই সঙ্গে হজ বা ওমরাহ যাত্রীদের উচিত বুকিংয়ের আগেই যাত্রাপথ ও রুট সম্পর্কে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া। বিশেষ করে ফিরতি যাত্রার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়। যাত্রীরা আগে থেকেই জেনে নেবেন ফেরার ফ্লাইটটি কি সরাসরি মদিনা থেকে ঢাকা, নাকি মদিনা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বাসযাত্রায় জেদ্দা গিয়ে সেখান থেকে ঢাকা ফিরতে হবে। এই তথ্য গোপন রাখা হলে বা আগেভাগে জানানো না হলে বয়স্ক, অসুস্থ ও নারী যাত্রীদের জন্য তা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই রুট–সংক্রান্ত তথ্য লিখিত চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। এ ছাড়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত মূল হজ এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে নাকি তাদের নিয়োজিত কোনো সাব-এজেন্টের সঙ্গে—তা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হজ এজেন্সির দায়িত্ব: এটি ব্যবসা নয়, একটি আমানত
হজ এজেন্সিগুলোর ভূমিকা এই ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু সেবা প্রদানকারী নয়; বরং মানুষের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র ইবাদতের অংশীদার। অথচ বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। প্রতিশ্রুতির তুলনায় দূরের হোটেল, নিম্নমানের বা অপর্যাপ্ত খাবার, বয়স্ক ও অসুস্থ হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার অভাব—এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অনেক সময় বিমান সংস্থা বা যাত্রা ব্যবস্থার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেভাগে জানানো হয় না, যার ফলে যাত্রীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। এই আচরণ শুধু অনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধেরও পরিপন্থী। হজ এজেন্সিগুলোর মনে রাখা উচিত তারা কোনো সাধারণ ভ্রমণ প্যাকেজ বিক্রি করছে না; তারা একটি ধর্মীয় আমানতের দায়িত্ব বহন করছে।
নীরবতার সংস্কৃতি: অনিয়ম টিকে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো হজ ও উমরাহ যাত্রীরা প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নীরবেই মেনে নিচ্ছেন। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, হজ অফিস কিংবা হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা প্রায় নেই বললেই চলে। এই নীরবতাই অনিয়মকারী এজেন্সিগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি। অভিযোগ না থাকলে তদন্ত নেই, তদন্ত না থাকলে শাস্তিও নেই—ফলে এসব এজেন্সি কার্যত আইনের বাইরে থেকেই বছরের পর বছর একই অনৈতিক আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতির সুযোগ নিয়েই সাম্প্রতিক সময়ে গুরুতর অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য হজযাত্রীকে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সে ফ্লাইট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষ মুহূর্তে “আসন খালি নেই” বা “কয়েক দিন পরে যেতে হবে”এমন অজুহাতে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা বা পূর্বসম্মতি ছাড়াই Flyadeal নামের একটি বাজেট এয়ারলাইনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই লেখকের সঙ্গে থাকা ৯ জনসহ মোট ৪০ জন যাত্রীকে খাবার, আসনব্যবস্থা বা যাত্রাসুবিধার বাস্তব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আগেভাগে কিছুই জানানো হয়নি। এর সরাসরি ভুক্তভোগী হয়েছেন বয়স্ক ও অসুস্থ হজ ও উমরাহ যাত্রীরা যাদের জন্য হজ ছিল ইবাদত, কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায়।
একইভাবে মক্কায় ৩০০–৪০০ মিটারের মধ্যে হোটেলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল-তাইসির পাহাড়ি এলাকার একটি হোটেলে রাখা হয় এবং মদিনায় মারকাজিয়া বা নিকটবর্তী এলাকায় আবাসনের কথা বলে বাস্তবে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার দূরের শাজা, আল-হিজরাহ রোড ও আল-সুকিয়া এলাকার একটি নিম্নমানের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সৌদি সরকারের উমরাহ মন্ত্রণালয়ের নুসুক অ্যাপ ব্যবহার ও রিয়াজুল জান্নাহ জিয়ারতের পারমিট সংগ্রহের নিয়ম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকা এবং হজ এজেন্সির অসহযোগিতার কারণে অসংখ্য উমরাহ যাত্রী—বিশেষত নারী যাত্রী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা জিয়ারত না করেই দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
এ বিষয়ে লেখকের কাছে একাধিক ভুক্তভোগীর প্রত্যক্ষ বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তাঁদের কেউই এখনো আইনগত পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নন। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে সমস্যাটি শুধু কিছু অসাধু এজেন্সির নয়; সমস্যাটি একটি জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার, যেখানে ভুক্তভোগীর নীরবতা ও প্রশাসনিক ঢিলেমি মিলেই অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
সরকারের দায়িত্ব: তদারকি ছাড়া ব্যবস্থাপনা অসম্পূর্ণ
সরকারের দায়িত্ব শুধু কোটা নির্ধারণ বা নিবন্ধন ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কার্যকর হজ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী বা তথ্য গোপনকারী এজেন্সির বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটবে। পাশাপাশি হজ ও উমরাহ যাত্রীদের জন্য কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, অভিযোগ জানানোকে সহজ ও নিরাপদ করা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য আলাদা নির্দেশনা নিশ্চিত করা জরুরি। দৃশ্যমান শাস্তির নজির তৈরি না হলে এই অনিয়ম থামবে না।
শেষ কথা: পবিত্র যাত্রা হোক স্বস্তির ও সম্মানের
হজ ও উমরাহ কোনো বিলাসী ভ্রমণ নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও ধৈর্যের ইবাদত। এই যাত্রা যেন প্রতারণা ও ভোগান্তির গল্পে পরিণত না হয়, সে জন্য হজ ও উমরাহ যাত্রী, হজ এজেন্সি ও সরকারের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে হজ ও উমরাহ আবার ফিরে পাবে তার প্রকৃত মর্যাদা একটি শান্ত, পবিত্র ও জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে।
খালেদ মোর্শেদ : উন্নয়নকর্মী
