নাছির উদ্দিন সোহেল, সিবিএন:

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় জ্বালানি তেল বিক্রিকে ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি খাল ও উপকূলীয় নৌপথসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা একাধিক অনুমোদনহীন তেল বিক্রয়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে এসব কেন্দ্র সিলগালা করার পরও কয়েকটি কেন্দ্র ফের চালু হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

একই সঙ্গে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কেন্দ্রের কোনো কোনোটি থেকে নৌপথে জ্বালানি তেল পাচার করা হচ্ছে। তেল পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন সময়ে অভিযান ও আটকের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসনের অভিযান, সিলগালা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পরও কীভাবে একই এলাকায় আবারও তেল বিক্রির কার্যক্রম চালু হচ্ছে?

অন্যদিকে, অনুমোদনহীন কেন্দ্র বন্ধের ফলে তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা এলাকার শত শত ফিশিং বোট ও ট্রলার মালিক জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যায় পড়েছেন। তাদের দাবি, অবৈধ কেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি এলাকায় বৈধ ও নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় জেলেদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ আগস্ট কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা সরকারি খাল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে লাইসেন্সবিহীন পাঁচটি ভাসমান তেল বিক্রয়কেন্দ্র ও একটি তেলের দোকানসহ মোট ছয়টি কেন্দ্র সিলগালা করা হয়। একই অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

প্রশাসনের এই অভিযানের পর কিছুদিন তেল বিক্রি বন্ধ ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। তবে পরবর্তীতে সিলগালা করা কয়েকটি কেন্দ্রের তালা ভেঙে পুনরায় কার্যক্রম শুরুর অভিযোগ ওঠে।

সরেজমিনে কুতুবজোম-ঘটিভাঙ্গা সেতুর নিচে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি নেতা শাহেদ খানের মালিকানাধীন মেসার্স মদিনা ট্রেডিংয়ের সিলগালা করা স্থাপনার তালা খোলা রয়েছে। সেখানে থাকা এক কর্মচারী জানান, কয়েক দিন আগে তালা খোলা হয়েছে।

তবে তেল বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে ওই কর্মচারী দাবি করেন, আগের হিসাবপত্র দেখার জন্য তালা খোলা হয়েছে; সেখানে তেল বিক্রি করা হচ্ছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় একাধিক ব্যক্তির মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত তেল বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, রুকন উদ্দিন, রিমন মেম্বার, নজরুল ইসলাম ও জয়নালের মালিকানাধীন কয়েকটি কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও তেল পাচারের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, স্থানীয়ভাবে এসব কেন্দ্র থেকে নৌযানে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয় এবং এর একটি অংশ নৌপথে অন্যত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা ও আশপাশের উপকূলীয় নৌপথে জ্বালানি তেল, সিমেন্টসহ বিভিন্ন মালামাল পাচারের সময় বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি ফিশিং বোট জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। এসব অভিযানে তেল পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করার ঘটনাও রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

তেল বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি কেন্দ্র সরকারি খাল ও নৌপথসংলগ্ন এলাকায় ভাসমান বা অস্থায়ী স্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে দাহ্য পদার্থ হিসেবে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন দ্রুত নৌযান ও আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সচেতন মহলের মতে, শুধু তেল বিক্রির অনুমোদন রয়েছে কি না—এটি দেখলেই হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশ, নৌযান নিরাপত্তা, সরকারি জায়গা ব্যবহারের অনুমতি এবং জ্বালানি সংরক্ষণের বৈধতাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এখানে সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা এলাকার শত শত মাছ ধরার ট্রলার ও ফিশিং বোট নিয়মিত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যায়। এসব নৌযানের জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় অনুমোদিত কোনো জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র না থাকায় অবৈধ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার পর জেলেদের দূরের এলাকা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে সাগরে যেতে না পারায় মাছ ধরার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

তাজিয়াকাটার জেলে মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, “এত বছর ধরে আমরা এই ঘাটের পাম্প থেকে তেল নিয়ে সাগরে যাচ্ছি। এখন প্রশাসন বন্ধ করায় বিভিন্ন জায়গা থেকে তেল সংগ্রহ করে সাগরে যেতে হচ্ছে। কিছুদিন পরপর এসব কেন্দ্র খুললেও আমাদের কষ্ট শেষ হচ্ছে না। আমরা এত কিছু বুঝি না, টাকা দিয়ে তেল কিনি। এখানে বৈধ কোনো পাম্প স্থাপন করা হলে আমাদের জন্য ভালো হয়।”

প্রশাসনের অভিযানে ছয়টি কেন্দ্র সিলগালা করা হলেও পরবর্তীতে কোনো কোনো কেন্দ্র পুনরায় খোলার অভিযোগ উঠেছে। সিলগালা ভাঙার পরও যদি সেখানে তেল বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিলগালা একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম। এটি ভেঙে পুনরায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে বিষয়টি শুধু অনুমোদনহীন ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রশাসনিক আদেশ অমান্যের বিষয়টিও সামনে আসে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সিলগালা করা প্রতিটি কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তালিকা করা উচিত। পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোর মালিকানা, লাইসেন্স, জ্বালানি সংরক্ষণের অনুমতি এবং পূর্বের জরিমানা বা মামলার তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সবিহীন ভাসমান তেলের দোকানগুলো সিলগালা করা হয়েছিল। কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

তিনি বলেন, “সিলগালা করার পর যদি তারা পুনরায় কার্যক্রম চালু করে থাকে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”