এম আর মাহবুব
আশির দশক থেকেই অগ্রজ গিয়াস ভাইয়ের সাথে আমার চেনা-জানা। উনি পড়তেন চকরিয়ার খুটাখালী হাই স্কুলে আর আমি ঐতিহ্যেবাহী কিশলয়ে। প্রতিবছর উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে বিজ্ঞান মেলা আসলেই প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি স্কুলের প্রতিযোগী হিসেবে গিয়াস ভাইকে সামলাতে হতো।
উনি ছিলেন আশির শেষ দিকে এবং নব্বই দশকের শুরুতে জেলার সেরা ক্ষুদে বিজ্ঞানী। তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি ছিল প্রখর। সেই সময় দেশসেরা বিজ্ঞান সাময়িকীতে উনার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে এসএসসির গন্ডি পেরিয়ে ১৯৯১ সালে আমি যখন কক্সবাজার সরকারী কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হই, তখন গিয়াস ভাই এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
এরপর নব্বই দশকের শুরুতে গিয়াস ভাই দৈনিক কক্সবাজারে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। অল্প সময়ে গিয়াস ভাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা দিয়ে সবার নজর কাড়েন। আর আমার ১৯৯৬ সালে দৈনিক হিমছড়ি দিয়ে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়। শ্রদ্ধার জায়গা থেকে গিয়াস ভাই আমাকে অনেক স্নেহ করতেন।
★বনেদি পরিবারের সন্তান গিয়াস ভাই মিসকিন ছিলেননা!
গিয়াস ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর কয়েক সহযোদ্ধার ফেবুতে তাকে অভুক্ত, মিসকিন, হতদরিদ্র, অভাবী, চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়া, কপাল পুড়া হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ গিয়াস ভাই খুটাখালীর বনেদি ও উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। খুটাখালীর দক্ষিণ পাড়ার আলহাজ্ব রশিদ আহমদ এর ছয় পুত্র সন্তানের মধ্যে গিয়াস ভাই সবার বড়। উনার ছোট ভাই ড. মুহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উচ্চপদে কর্মরত আছেন। উনার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ড. রিয়াজের ইমিডিয়েট বড় অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ চকরিয়া মহিলা কলেজে শিক্ষকতা পেশায় আছেন।২য় ভাই ডা. সাহাব উদ্দিন খ্যাতনামা পল্লী চিকিৎসক। তৃতীয় ভাই মিনহাজ উদ্দিন টিপন খুটাখালীর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। চতুর্থ ভাই আসাব উদ্দিন লিটন ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা করেন। বোনদের মধ্যে নার্গিস আরার স্বামী মাদ্রাসা শিক্ষক ও তসলিমা আক্তারের স্বামী প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। গিয়াস ভাইয়ের মমতাময়ী মা এখনো বেঁচে আছেন। আর চিকিৎসার কথা যেহেতু আসছে, তবে বলি- কক্সবাজারের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মদ ইউনুস ভাই গিয়াস ভাইয়ের আপন চাচাতো ভাই।
এছাড়া কক্সবাজার সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর নাজের স্যার গিয়াস ভাইয়ের চাচা হন।
★খেয়ালি গিয়াস ভাই…..
সত্য যে, গিয়াস ভাই ছিলেন অন্যধাচে গড়া কক্সবাজারের ঘাড়ত্যাড়া সাংবাদিক, গবেষক, প্রকৃতি প্রেমিক, সর্বোপরি খেয়ালি একজন মানুষ। কলাতলির বড়ছড়া ও জীর্ণ কুঁড়েঘর উনার পারিবারিক স্ট্যাটাসে যায়না। ব্যক্তি জীবনে উনার ভাগ্য ও খেয়ালিপনায় একাকার হয়ে বন্দী হয়েছে মেধাবী গিয়াসের যাবতীয় সুখ -সমৃদ্ধি! উনার বাবা ও ভাইয়ের যে সহায় সম্পদ, চাইলেই গিয়াস ভাই আধুনিক শিক্ষার তীর্থ কেন্দ্র খুটাখালীতে পরিবার নিয়ে রাজার হালে বাস করতে পারতেন।
★আমাদের ভালোবাসা……
গিয়াস ভাই একসময় কক্সবাজার প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সদস্য ছিলেন। সত্য যে, গিয়াস ভাই সংগঠনের নিয়ম, গঠনতন্ত্র বিশ্বাস করতেননা। তাই সময়ের ধারাবাহিকতায় দুই সংগঠনের হিসেবের খাতায় উনার নাম ছিলনা। কিন্তু গিয়াস ভাইকে কক্সবাজার প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজার কখনো পর ভাবেননি। চলতি বছরের শুরুতে গিয়াস ভাইয়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কক্সবাজার প্রেসক্লাব ও জেইউসি’র কর্মকর্তারা উনার জন্য ঢাকার সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ৫০ হাজার টাকার অনুদানের চেক এনে দিয়েছেন। জুলাই- আগস্ট বিপ্লবের পর কক্সবাজারের সাংবাদিকদের প্রধান দুই সংগঠনের মানবিক সাহায্যে গিয়াস ভাইয়ের নামটি থাকতো সবার উপরে। ভাবী এবং বড় ছেলেই সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী। গিয়াস ভাইয়ের মৃত্যুর পর অনেকেই ফেবুতে ভালোবাসা ও মানবিকতার ঝড় তুলেছেন, ভালো! কিন্তু একবারও কী ভেবে দেখেছেন গিয়াস ভাইয়ের শেষ ঠিকানা কোথায়? উত্তরঃ খুটাখালীর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে। অথচ খেয়ালি গিয়াস ভাইয়ের বনেদি ও সমৃদ্ধ পরিচয় আড়াল করতে আমরা ঝুপড়ি ঘরের কিচ্ছা খুঁজছি।
আবার অনেকেই না পাওয়ার বেদনা থেকে মরহুম গিয়াস ভাইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে পুঁজি করে জঘন্যভাবে সংগঠন তথা ব্যক্তির দোষ খুজতে উঠেপড়ে লেগেছেন।
তবে, সবকথার শেষ কথা” কুল্লু নাফ সিন যা-ই কাতুল মউত”
আল্লাহ মরহুম গিয়াস ভাইয়ের নেক আমল গুলো কবুল করে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান বানিয়ে নিন, আমিন। ভাবী ও বাচ্চাদের শোক সইবার তৌফিক দিন, আমিন।
এম আর মাহবুব
কক্সবাজার প্রতিনিধি
দৈনিক কালবেলা
সহ- সভাপতি
সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজার।
ক্রীড়া সম্পাদক
কক্সবাজার প্রেসক্লাব
