নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পরিবর্তন, বৈশ্বিক ক্ষমতার ন্যায্য বণ্টন, শরণার্থী সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং কার্যকর বহুপাক্ষিকতার মাধ্যমে জাতিসংঘকে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার উপযোগী করে তোলার আহ্বান
মোঃ ইলিয়াছ মিয়া:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া জাতিসংঘ আজ ৮১ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সংস্থাটি বিশ্বকে যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা করা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির এক ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আট দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সংলাপ, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন সহযোগিতা, শান্তিরক্ষা এবং বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। তবু আজকের বিশ্বে যুদ্ধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের অসম প্রয়োগ জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
জাতিসংঘের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই কেবল অতীতের অর্জন উদ্জাপনের উপলক্ষ নয়; এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলার সময়। বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় কারা সিদ্ধান্ত নেয়, কারা সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দেয়, কারা সুরক্ষা পায় এবং কারা বারবার উপেক্ষিত থাকে? একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যদি বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের প্রত্যাশা ধারণ করতে না পারে, তাহলে তার প্রতিনিধিত্ব, কর্তৃত্ব ও জবাবদিহির ভিত্তি নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি।
আমার বিবেচনায়, জাতিসংঘের জন্য শুধু কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন বা সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তি, যার ভিত্তি হবে ন্যায়বিচার, সমতা, মানবিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন এবং বহুপাক্ষিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার কার্যকর অংশগ্রহণ।
১. জাতিসংঘের সংকট: প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু কর্তৃত্বের প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা
জাতিসংঘের অন্যতম মৌলিক সীমাবদ্ধতা হলো, এর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা অনেকাংশে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থায়ন এবং সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে সমান নয়। কোনো সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, আবার অন্য কোনো সংকটে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ কিংবা শক্তিধর রাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে কার্যকর উদ্যোগ বিলম্বিত হয়।
এই বাস্তবতা জাতিসংঘের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে। তবে সমস্যার সমাধান হিসেবে জাতিসংঘকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা বা বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করা কোনো কার্যকর পথ নয়। বরং জাতিসংঘকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক আইন শুধু দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর প্রয়োগের উপকরণ না হয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রসহ সবার জন্য সমান নীতি ও জবাবদিহির ভিত্তি হয়।
জাতিসংঘের নিজস্ব পর্যালোচনাতেও ব্যবস্থাগত জটিলতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। ১৯৪৬ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের গৃহীত ৪০ হাজারের বেশি প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত ও সভাপতির বিবৃতির মধ্যে প্রায় ৪ হাজার সক্রিয় বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে বলে জাতিসংঘের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান একা কোনো উদ্যোগের সাফল্য বা ব্যর্থতার পূর্ণ মূল্যায়ন নয়, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং ফলাফল পরিমাপের মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।
২. নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার: বর্তমান বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত অঙ্গ। বর্তমানে পরিষদের সদস্যসংখ্যা ১৫। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন স্থায়ী সদস্য এবং বাকি ১০টি আসন অস্থায়ী সদস্যদের জন্য নির্ধারিত। পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
এই কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিফলন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যা, অর্থনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকির বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। আফ্রিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশের জনগণ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব বহন করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত।
নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে তাই তিনটি বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
প্রথমত, আফ্রিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারকে আরও জবাবদিহিমূলক করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, বিশেষ করে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, যুক্তি প্রকাশ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরামর্শের সুযোগ বাড়াতে হবে।
নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণ কিংবা ভেটো ব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের মতো জটিল আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। তাই এগুলো সহজ বা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়। তবু কঠিন বলেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। বিশ্বশান্তির দায়িত্ব পালনের জন্য যে প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, তার প্রতিনিধিত্ব ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
৩. জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ভূখণ্ড ও বিকেন্দ্রীভূত সদর দপ্তরের সম্ভাবনা
জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে অবস্থিত। এই অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতে জাতিসংঘের কার্যক্রমকে আরও বিকেন্দ্রীভূত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈশ্বিকভাবে সহজলভ্য করার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা করা যেতে পারে।
একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব হলো, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে জাতিসংঘের জন্য বিশেষ আন্তর্জাতিক আইনি মর্যাদাসম্পন্ন একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। এর উদ্দেশ্য হবে কোনো একক রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত কর্তৃত্বের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং জাতিসংঘের বৈশ্বিক চরিত্রকে আরও দৃশ্যমান করা।
একই সঙ্গে উত্তর আফ্রিকায় একটি আঞ্চলিক বা অতিরিক্ত প্রশাসনিক সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। মিশর, তিউনিসিয়া, মরক্কো ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলোকে নিয়ে প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা, যাতায়াত, অবকাঠামো, ব্যয়, কূটনৈতিক প্রবেশাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি বিবেচনা করতে হবে।
এটি জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামোর কোনো বিদ্যমান সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনার একটি প্রস্তাব। বাস্তবায়নের আগে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, আইনি পর্যালোচনা এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রয়োজন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতিসংঘকে কোনো একটি অঞ্চল বা রাষ্ট্রের প্রতীকী সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বের সব অঞ্চলের জন্য আরও প্রবেশযোগ্য ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
৪. মহাসচিবের ভূমিকা: কূটনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কার্যকর সংকট প্রতিরোধ
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সংলাপ, মধ্যস্থতা এবং বৈশ্বিক উদ্বেগ তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু অনেক সংকটে মহাসচিবের উদ্যোগ রাজনৈতিক বিভাজন, সদস্যরাষ্ট্রের অনীহা, সীমিত সম্পদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।
মহাসচিবের কার্যালয়কে আরও কার্যকর করতে হলে সংঘাতের আগাম সতর্কতা, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রতিরোধমূলক কূটনীতি এবং দ্রুত মধ্যস্থতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য স্বাধীন বিশ্লেষণী ব্যবস্থা, আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
তবে মহাসচিবের ক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ব সৃষ্টি করা নয়। জাতিসংঘ সনদ, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়িত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে থেকেই নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সংকটে মহাসচিবের উদ্যোগ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে স্বচ্ছতা ও আস্থা উভয়ই বাড়তে পারে।
৫. জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা: প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রস্তুতিও প্রয়োজন
যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সময়মতো সহায়তা পৌঁছানো জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বিভিন্ন সংকটে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন, সরবরাহ, নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়।
জাতিসংঘের অধীনে একটি স্থায়ী জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। এর প্রাথমিক উপাদান হতে পারে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য চিকিৎসা ও উদ্ধার দল, বেসামরিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, জরুরি যোগাযোগ ও সাইবার নিরাপত্তা সহায়তা, সরবরাহব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার দল।
এ ধরনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জাতিসংঘ সংস্থা, মানবিক সমন্বয়ব্যবস্থা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন থাকতে হবে। নতুন কাঠামো তৈরি করে পুরোনো কাঠামোর পুনরাবৃত্তি ঘটানো উচিত নয়।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অনুমোদিত যেকোনো নিরাপত্তা বা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের জন্য সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট, সদস্যরাষ্ট্রের সম্মতি যেখানে প্রয়োজন, কার্যকর তদারকি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সক্ষমতার উদ্দেশ্য হবে মানুষের জীবন রক্ষা, সংঘাত প্রতিরোধ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অযৌক্তিকভাবে ক্ষুণ্ন করা নয়।
৬. UN80 উদ্যোগ: শুধু ব্যয় কমানো নয়, ফলাফল বাড়ানো
জাতিসংঘের UN80 Initiative প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর কর্মপরিকল্পনায় ৮৬টি পদক্ষেপ, তিনটি কর্মধারা এবং ৩১টি কর্মপ্যাকেজের কথা বলা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের কাজকে আরও কার্যকর করা, ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করা এবং ব্যবস্থাগত সংস্কারের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা।
তবে জাতিসংঘ সংস্কারকে শুধু বাজেট কমানো, কর্মী ছাঁটাই বা প্রশাসনিক কাঠামো সংকুচিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রকৃত সংস্কার হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একই ধরনের দায়িত্ব পালনকারী ইউনিটগুলোর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি কমবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় হ্রাস পাবে এবং মাঠপর্যায়ে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর সক্ষমতা বাড়বে।
জাতিসংঘের সংস্থা, বিভাগ, কমিশন, প্রতিবেদন এবং ম্যান্ডেটগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতটি সভা হয়েছে, কতটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বা কতটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং মানুষের জীবন, অধিকার, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে কী পরিবর্তন এসেছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।
সংস্কারের প্রতিটি পদক্ষেপে উন্নয়নশীল দেশ, স্বল্পোন্নত দেশ এবং মানবিক সংকটে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। দক্ষতা বাড়ানোর নামে মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সেবা দুর্বল হলে তা সংস্কারের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করবে।
৭. ভবিষ্যতের জন্য অঙ্গীকার: Pact for the Future বাস্তবায়ন জরুরি
২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো Pact for the Future গ্রহণ করে। এতে ৫৬টি কর্মমুখী অঙ্গীকারের পাশাপাশি Global Digital Compact এবং Declaration on Future Generations অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তা, ডিজিটাল সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অঙ্গীকার গ্রহণই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন, অগ্রগতি পরিমাপ এবং জনসম্মুখে জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন।
জাতিসংঘকে এমন একটি প্রকাশ্য বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে, যেখানে সদস্যরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা যাবে। নাগরিক সমাজ, গবেষক, যুবসমাজ এবং প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগও থাকতে হবে।
একটি নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তির ভিত্তি হতে পারে এই নীতি: বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি শুধু কূটনৈতিক দলিলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার বাস্তব সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছাতে হবে।
৮. শরণার্থী ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি: মানবিক দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন
জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট। UNHCR-এর বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে বিশ্বে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ছিলেন। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষা ও জীবিকার ক্ষতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা।
শরণার্থী সুরক্ষার দায়িত্ব কোনো একটি দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমিত সম্পদের কারণে অনেক উন্নয়নশীল দেশ দীর্ঘদিন ধরে বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দায়িত্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অর্থায়ন, পুনর্বাসনের সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট এই বৈশ্বিক ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মিয়ানমারে নিপীড়ন ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি শুধু শরণার্থীদের জীবনকেই অনিশ্চিত করে তোলেনি; কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের বাস্তব নিশ্চয়তা প্রয়োজন। প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই। কোনো শরণার্থীকে অনিরাপদ পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে বাধ্য করা উচিত নয়।
জাতিসংঘ, UNHCR, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা যুবসমাজের মতামত, নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে। শরণার্থীদের কেবল সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণকারী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
একটি নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তিতে শরণার্থী সুরক্ষা হবে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব, আর আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ন্যায্য সহায়তা হবে সেই দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৯. জলবায়ু ন্যায়বিচার: বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সুরক্ষায় রূপান্তর
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অভিবাসন, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যা বহু মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করছে। অথচ জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে যাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম, তারাই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) এবং প্যারিস চুক্তি আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান এখনো বড়।
UNEP-এর ২০২৬ সালের Emissions Gap Report অনুযায়ী, বর্তমান জাতীয় জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারায় চলতি শতকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য মাত্রা প্রায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উষ্ণতা সীমিত রাখার সম্ভাব্য পথের সঙ্গে সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনতে ২০২৫ সালের তুলনায় বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এই পূর্বাভাস দেখায়, ঘোষিত লক্ষ্য যথেষ্ট নয়; দ্রুত ও গভীর নিঃসরণ হ্রাস, অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জাতিসংঘের জলবায়ু ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রথমত, উচ্চ নিঃসরণকারী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে ব্যবধান স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য এবং সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, সীমান্ত অতিক্রমী স্থানচ্যুতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, নিরাপদ আবাসন, জীবিকার বিকল্প, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং পরিকল্পিত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। জলবায়ু ন্যায়বিচারের অর্থ হলো, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শুধু সহানুভূতি দেখানো নয়; তাদের অধিকার, প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কার্যকর দায়িত্ব গ্রহণ করা।
১০. অর্থায়ন, স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার ম্যান্ডেটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের ওপর। সদস্যরাষ্ট্রগুলো যদি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব গ্রহণ করে কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ, জনবল ও রাজনৈতিক সহযোগিতা না দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর ভূমিকা পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তিতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আর্থিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হতে হবে। জাতিসংঘের বাজেট, ব্যয়, প্রকল্পের ফলাফল এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সহজবোধ্য ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থায়নের ঘাটতি কীভাবে মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে, তা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে।
তবে জবাবদিহি শুধু জাতিসংঘের কর্মকর্তা বা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব নির্বিশেষে ন্যায়সংগত ও ধারাবাহিক জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হলে তাকে প্রয়োজনীয় সম্পদ দিতে হবে; একই সঙ্গে সেই সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার স্বচ্ছতা ও ফলাফলও নিশ্চিত করতে হবে।
১১. নাগরিক সমাজ, যুবসমাজ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ
বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের, নাগরিক সমাজের, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শরণার্থী এবং অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
যুবসমাজ শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়; তারা বর্তমানের সিদ্ধান্ত, সংকট ও নীতির সরাসরি অংশীদার। জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল বৈষম্য, সংঘাত, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে শরণার্থী ও সংঘাতপ্রবণ এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা ছাড়া সংশ্লিষ্ট নীতি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
জাতিসংঘের বিভিন্ন পরামর্শ প্রক্রিয়া, নীতিনির্ধারণী সভা এবং বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় নাগরিক সমাজ ও যুবসমাজের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অংশগ্রহণ বলতে শুধু আমন্ত্রণ বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ বোঝালে চলবে না; মতামত কীভাবে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে, সেটিও স্পষ্ট করা উচিত।
বিশেষত গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর নাগরিক সংগঠন ও তরুণ নেতাদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। ভ্রমণ ও অংশগ্রহণ ব্যয়ের বাধা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অসমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশাধিকারের প্রতিবন্ধকতা কমানো জরুরি।
একটি বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তি তখনই অর্থবহ হবে, যখন যাদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তারাও সেই সিদ্ধান্ত তৈরিতে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারবেন।
১২. নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তির ভিত্তি কী হবে?
নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তি বলতে জাতিসংঘের সনদ বা আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করা বোঝায় না। বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে বিদ্যমান নীতিগুলোর প্রয়োগকে আরও ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কার্যকর করার একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার বোঝায়।
এই চুক্তির অন্তত ছয়টি ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, সমান মর্যাদা ও ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব। রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক শক্তি যাই হোক, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ ও কণ্ঠস্বরের যথাযথ প্রতিফলন থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ। শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য ভিন্ন মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং ধারাবাহিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, যৌথ দায়িত্ব ও ন্যায্য বোঝা বণ্টন। জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট, মহামারি ও সংঘাতের মতো আন্তঃসীমান্ত সমস্যার দায়িত্ব একক রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
চতুর্থত, প্রতিরোধমূলক কূটনীতি ও মানবিক সুরক্ষা। সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আগাম সতর্কতা, মধ্যস্থতা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তার প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পঞ্চমত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন, অর্থায়ন এবং ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যর্থতা শনাক্ত করে সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ষষ্ঠত, অংশগ্রহণমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা। যুবসমাজ, নাগরিক সমাজ, নারী, শরণার্থী, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
এই ভিত্তিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন হবে। তাই নতুন সামাজিক চুক্তি সংস্কারের বিকল্প নয়; এটি সংস্কারের লক্ষ্য ও নৈতিক ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান।
উপসংহার: জাতিসংঘকে নতুন করে মানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে
জাতিসংঘের ৮১ বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন এবং জলবায়ু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোনো রাষ্ট্র এককভাবে সব বৈশ্বিক সংকটের সমাধান করতে পারে না। একই সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, পর্যাপ্ত সম্পদ এবং জনগণের আস্থা ছাড়া কার্যকর হতে পারে না।
তাই জাতিসংঘের সামনে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব। একদিকে প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার, সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং যৌথ দায়িত্বের নীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ, মহাসচিবের সংকট প্রতিরোধের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা, UN80 উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন, Pact for the Future-এর অঙ্গীকার পূরণ, শরণার্থী সুরক্ষা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারকে একই বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু তার সদর দপ্তর কোথায়, কতটি সংস্থা রয়েছে বা কতটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, তার ওপর নয়। নির্ভর করবে যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে, বাস্তুচ্যুতদের নিরাপত্তা দিতে, জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলা করতে এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিষ্ঠানটি কতটা সক্ষম হচ্ছে, তার ওপর।
৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই আমাদের আহ্বান হওয়া উচিত: জাতিসংঘকে শুধু প্রশাসনিকভাবে সংস্কার নয়, বরং নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে আরও ন্যায়সংগত, প্রতিনিধিত্বশীল, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
কারণ বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যৎ কেবল রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার বিষয় নয়; এটি মানবজাতির যৌথ ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। বিশ্বকে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো জনগোষ্ঠী পরিত্যক্ত হবে না, কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না এবং কোনো মানুষের মর্যাদা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কাছে গৌণ হয়ে পড়বে না।
জাতিসংঘের ৮১ বছর হোক একটি নতুন অঙ্গীকারের সূচনা: ক্ষমতার নয়, ন্যায়বিচারের; আধিপত্যের নয়, সহযোগিতার; এবং কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের ভিত্তিতে একটি নতুন বৈশ্বিক সামাজিক চুক্তি গড়ে তোলার অঙ্গীকার।
লেখকঃ প্রধান নির্বাহী, সিইএইচআরডিএফ (CEHRDF)
প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর ইনস্টিটিউশনাল রিফর্মস
আহ্বায়ক, গ্লোবাল সাউথ লিডার্স নেটওয়ার্ক
