পেকুয়া প্রতিনিধি
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে সরকারি বিধিনিষেধ ও নির্দেশনা নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অপমান করার অভিযোগ উঠেছে ইউএনওর কার্যালয়ের এক অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। সেই বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়নে মাছ ব্যবসায়ী ডাকা হয়।
এই মিটিংয়ে “এখানে দুর্গন্ধ আসছে কেন? “তোমাদের গা দিয়ে গন্ধ আসছে” এবং “এটি এসি রুম, লুঙ্গি পরে এসেছ কেন”? এ ধরনের মন্তব্য করার অভিযোগ করেছেন বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
অভিযোগের পর ক্ষুব্ধ মাছ ব্যবসায়ীরা অভিযুক্ত অফিস সহকারী নিতাই দাশের অপসারণ, বদলি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তবে নিতাই দাশের দাবি, তিনি মাছ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ করে কোনো মন্তব্য করেননি। তাঁর ভাষ্য, ইউএনওর কক্ষে ঢোকার পর তিনি গন্ধ পান এবং দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
অন্যদিকে, পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেছেন, “আসলে এ ধরনের তেমন কিছুই হয়নি”। তবে তিনি নিতাই দাশকে চুপ থাকতে নিষেধ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগরে মাছ ধরা ও মাছ আহরণসহ সরকারি বিধিনিষেধ এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করতে ইউএনওর কার্যালয়ে ওই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মৎস্য কর্মকর্তার ফোন পেয়ে মাছ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, মাছ বাজারের ইজারাদারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইউএনওর কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
বৈঠকে ইউএনও রফিকুল ইসলাম, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বুলবুল আকতার, মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী নৌ পুলিশের দুই কর্মকর্তা, বরফকলের মালিক জাহাঙ্গীর আলম, শাহাব উদ্দিন, মৎস্যজীবী দলের সভাপতি হারুনুর রশিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৈঠক শুরুর প্রায় ১০ মিনিট পর ইউএনওর অফিস সহকারী নিতাই দাশ কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি কক্ষে দুর্গন্ধ থাকার কথা বলে মাছ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিতাই বলেন, “এখানে দুর্গন্ধ আসছে কেন”, “তোমাদের গা দিয়ে গন্ধ আসছে”, “জানালা খুলে দাও” এবং “এটি এসি রুম, লুঙ্গি পরে আসছ কেন”?
এ ধরনের মন্তব্যে বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা বিব্রত ও অপমানিত বোধ করেন বলে দাবি করেছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে ইউএনও রফিকুল ইসলাম নিতাই দাশকে চুপ থাকতে বলেন। এরপরও তিনি বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকেন। এ সময় মৎস্যজীবী দলের সভাপতি হারুনুর রশিদ নিতাই দাশের আচরণের প্রতিবাদ করেন।
হারুনুর রশিদ বলেন, নিতাই দাশ দুর্গন্ধের কথা বলার পর তিনি সেখানে উপস্থিত নৌ পুলিশের কর্মকর্তা ও মৎস্য কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা কোনো দুর্গন্ধ পাচ্ছেন কি না। তাঁদের কেউ দুর্গন্ধের কথা বলেননি বলে তাঁর দাবি।
হারুনুর রশিদের ভাষ্য, নিতাই দুর্গন্ধের কথা বললে উপস্থিত নৌ পুলিশ কর্মকর্তা ও মৎস্য কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এখানে কোনো দুর্গন্ধ পাচ্ছেন কি না। তাঁরা সবাই বলেছেন, এখানে দুর্গন্ধ নেই। কিন্তু নিতাই একবার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিলেন, আবার একজনকে দিয়ে জানালা বন্ধ করে দিচ্ছিলেন। আমরা যে মানুষ, সেটাও তিনি যেন বিবেচনায় নেননি।
তিনি আরও বলেন, অফিস সহকারী নিতাই দাশের এমন বিব্রতকর আচরণে আমরা মর্মাহত। এ ধরনের আচরণ করা তাঁর ঠিক হয়নি। তাই আমি প্রতিবাদ করেছি।
বৈঠক শেষে পেকুয়া বাজার মাছ বিক্রয় ভবনের দ্বিতীয় তলায় ব্যবসায়ীদের কার্যালয়ে মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একত্রিত হন। সেখানে তাঁরা নিতাই দাশের কথাবার্তা ও আচরণের প্রতিবাদ জানান এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন।
মাছ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের পেশা ও পোশাক নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা অসম্মানজনক।
ব্যবসায়ীদের একজন বলেন, আমরা মাছ ব্যবসায়ী হতে পারি, কিন্তু আমরা মানুষ। ২৪ ঘণ্টা মাছ নিয়ে কাজ করি বলে আমাদের শরীরে মাছের গন্ধ থাকতেই পারে। সরকারি নির্দেশনা শুনতে ডেকে নিয়ে গিয়ে সবার সামনে এভাবে অপমান করা হবে, এটা আমরা আশা করিনি।
তাঁদের প্রশ্ন, লুঙ্গি পরে সরকারি কার্যালয়ে যাওয়াকে যদি আপত্তিকর মনে করা হয়, তাহলে তাঁদের বৈঠকে ডাকা হলো কেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।
পেকুয়া বাজারের মাছ বিক্রয় ভবনের ইজারাদার আব্দুল মান্নান বলেন, মৎস্য কর্মকর্তা ফোন করে বৈঠকে যেতে বলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ইউএনওর কার্যালয়ে যান।
আব্দুল মান্নানের ভাষ্য, বৈঠক চলাকালে অফিস সহকারী নিতাই রুমে ঢুকে দুর্গন্ধ, লুঙ্গি ও এসি রুম নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। ইউএনও তাঁকে চুপ থাকতে বললেও তিনি তা শোনেননি। আমাদের চরমভাবে অপমান করা হয়েছে। আমরা তাঁর অপসারণসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
বরফকলের মালিক জাহাঙ্গীর আলমও নিতাই দাশের মন্তব্যকে অপমানজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সবার উপস্থিতিতে নিতাই দাশের এমন মন্তব্য খুবই মানহানিকর ও বিব্রতকর। এ ধরনের আচরণে আমরা চরম ক্ষুব্ধ। মাছ ব্যবসায়ীরাও মানুষ।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহকারী নিতাই দাশ বলেন, মাছ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ করে তিনি ওই মন্তব্য করেননি।
তিনি বলেন, ‘স্যারের রুমে ঢুকে দেখি গন্ধ। দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় গন্ধ লেগেছে।’
তবে বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীদের পোশাক নিয়ে ‘লুঙ্গি পরে এসেছেন কেন’—এ ধরনের মন্তব্যের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে এ ধরনের তেমন কিছুই হয়নি। নিতাইকে চুপ থাকতে নিষেধ করেছি।
এরপর তিনি জরুরি বৈঠক চলছে জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগরে মাছ ধরা ও মাছ আহরণের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে মাছ ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের অবহিত করতেই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৈঠকটি আয়োজন করা হয়েছিল।
তবে বৈঠকে সরকারি নির্দেশনা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি একজন অফিস সহকারীর কথাবার্তা নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
