জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:

কক্সবাজারের টেকনাফে এক ধরনের সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বিসিআইসি ডিলারসহ খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা সারের জন্য আসছেন, আর না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। কৃষকদের অনেককে বস্তা বগলে নিয়ে সারের এই দোকান থেকে ওই দোকানে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। এদিকে সার ডিলারের আশপাশে ঘোরাঘুরি করা কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

কৃষকরা জানান, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে জমিতে সার প্রয়োগ করতে হয়। উক্ত দুই মাসই সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। ভরা মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধান যেমন ভালো হবে না, তেমনি ফলনও আশানুরূপ হবে না বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণের পর থেকে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। মাঝে কয়েক দিন বৃষ্টি থামলেও আগস্ট মাসের পুরো সময়েই টানা বৃষ্টি ছিল। ওই সময়ে কৃষকদের অনেকে জমিতে সার প্রয়োগ করলেও বৃষ্টির পানিতে অনেকটা ভেসে গেছে। এতে করে সব ধানী জমিতে পুনরায় সার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার কর্তৃক ইউরিয়া সার বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রি করার নির্দেশনা রয়েছে। আর টেকনাফের কোথাও ওই দামে সার বিক্রি হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট কৃষক সূত্রে জানা গেছে।

তাদের অভিযোগ, ইউরিয়া সার বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৬৫০ টাকা, টিএসপি সার ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ টাকা ও এমওপি সার ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তুলছেন কৃষকদের অনেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি অফিসের নির্দেশনার আলোকে ডিলার কর্তৃক বস্তার মুখ কেটে সার বিক্রি করা হচ্ছে। এরপরও বিভিন্নভাবে পাচারকারীদের হাতে সার পৌঁছে যাচ্ছে। এই সার আবার বিচ্ছিন্নভাবে মিয়ানমারে পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি বিজিবি মিয়ানমারে পাচারকালে ১০/২০ কেজি ফুটো সারসহ পাচারকারীদের কাছ থেকে সার জব্দ করেছে।

দেখা গেছে, ১০/২০ কেজি খুচরা সার সংগ্রহ করে পাচারকারীরা বস্তায় ভরে তা আবার নিজেরা সেলাই করে পাচার করে দিচ্ছেন। তবে উক্ত ঘটনার পর থেকে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেকটা নড়েচড়ে বসেছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর সার পাচার ও বিতরণে আরও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি শক্ত মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র মতে, হ্নীলা-হোয়াইক্যংয়ে কিছুটা সারের সংকট থাকলেও উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে কোনো ধরনের সংকট নেই। এদিকে টেকনাফের জন্য ইতিমধ্যে ৭০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ওই সার পাওয়া গেলে সংকট আর থাকবে না বলে জানা গেছে।

উপজেলার হ্নীলা পানখালী এলাকার কৃষক খলিল আহমদ জানিয়েছেন, চলতি আমন মৌসুমে ৪৫ কানি জমিতে ধানের চাষ করেছেন। চাষকৃত জমিতে প্রয়োগের জন্য সারের দোকানে দোকানে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ডিলাররা এ ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছেন দাবি করে সার না পাওয়ায় তিনি রীতিমতো উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন।

হোয়াব্রাং এলাকার কৃষক সরোয়ার আলম জানান, প্রায় ৪ একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেন। সারের জন্য তিনি শুধু ঘুরছেন আর ঘুরছেন। কিন্তু সার পাচ্ছেন না।

একই এলাকার কৃষক মোহাম্মদ হোছন জানান, ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করেছেন। সারের জন্য ডিলারের কাছে গেলে ১০/১৫ কেজির বেশি সার দেওয়া হয় না। যা খুবই অপ্রতুল।

লেদা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ হোছন জানান, জমিতে এখনো সার প্রয়োগ করতে পারেননি। ‘চিন্তা করতেছি, কী হবে। কোনো কিছুই বুঝতেছি না’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

হ্নীলার মরিচ্যাঘোনা এলাকার কৃষক জহির বৈদ্য জানান, ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করে মাত্র ১০ কেজি সার পেয়েছেন। এতে তিনি চরম দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

ছোট লেচুয়াপ্রাং এলাকার কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, ৫ কানি জমিতে আমনের চারা রোপণ ও দেড় কানি জমিতে ক্ষেত-খামার করেছেন। তিনি এখনো কোনো সার না পেয়ে জমিতে সার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।

হোয়াইক্যং কম্বনিয়াপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুস শুক্কুর ক্ষোভের সঙ্গে সার না পেয়ে জমি পরিত্যক্ত রাখার কথা জানিয়েছেন। ওই এলাকার কৃষাণী নুরুন্নাহার জানান, ৩ কানি জমিতে আমন ধান ও ১ কানি জমিতে ক্ষেত-খামার করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত কেবল ১৫ কেজি সার পেয়েছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

রইক্ষ্যং এলাকার কৃষক আব্দু শুক্কুর জানান, ২ একর জমিতে তিনি চাষাবাদ করেছেন। সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তিনি সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

রইক্ষ্যং পুটিবনিয়া এলাকার কৃষক কিউ চিং চা চাকমা জানান, তিনি এ বছর ৬ কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সংকটের কারণে জমিতে সার দিতে পারেননি। তিনি বেশ কয়েকবার হ্নীলায় এসেও সার না পেয়ে ফিরে গেছেন। কৃষক কিউ চিং চা চাকমা স্থানীয়ভাবে কেজিপ্রতি ৪০/৪৫ টাকায় সার কিনে জমিতে প্রয়োগের কথা জানিয়েছেন।

কাঞ্জরপাড়া এলাকার কৃষক কামাল উদ্দিন বাচ্চু জানান, ৮ কানি জমিতে ধান লাগিয়ে সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখনো সার পাননি জানিয়ে তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

লম্বাবিল তেচ্ছিব্রীজ এলাকার কৃষক শাহ আলম জানিয়েছেন, তিনিও এ মৌসুমে ২০ কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সারের জন্য হোয়াইক্যং ডিলার মোশতাকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি এক কেজি সারও পাননি বলে জানিয়েছেন।

সার নিয়ে টেকনাফে কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার চলছে জানিয়ে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও টেকনাফ উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, কারা নির্যাতিত বিএনপি নেতা শাহ নেওয়াজ কৃষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, টেকনাফের প্রকৃত কৃষকরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না। এতে সরকারের ভাবমূর্তি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হচ্ছে।

সীমান্তবর্তী এলাকা হিসেবে টুকটাক সার পাচারের সম্ভাবনা রয়েছে। যা এর আগের সরকারের আমলেও হয়েছে। কৃষিবান্ধব সরকার; তারেক রহমানের সরকারের ভাবমূর্তি যেন চোরাকারবারি ও মিয়ানমারে সার পাচারে জড়িতরা ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে জন্য তাদের চিহ্নিত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রয়ের কোনো সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে সার ডিলার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। তিনি উচ্চমূল্যে সার বিক্রি এবং সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে জানান।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রমাণিকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। মোবাইল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি এস.এম. অনীক চৌধুরী জানান, সার সংকটের বিষয়টি মোটেও সত্য নয়। তবে হ্নীলা-হোয়াইক্যংসহ টেকনাফ উপজেলায় নতুন করে ১১০ হেক্টর লবণ মাঠে ধানের আবাদ বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ৭০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। যা আগামী সপ্তাহে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া গেলে আর সমস্যা দেখা দেবে না বলে মনে করেন ইউএনও।