আজিজুর রহমান রাজু :

দীর্ঘদিনের দখল ও অবৈধ স্থাপনার জট খুলতে কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বাণিজ্যিক কেন্দ্র ঈদগাঁও বাজার ও স্টেশন এলাকায় টানা দুই দিনের অভিযানে স্কেভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া এ উচ্ছেদ অভিযান বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিনভরও চলে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মংচিংনু মারমার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বাজার ও স্টেশন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফুটপাত এবং অলিগলিতে থাকা অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়।

প্রথম দিনের অভিযানে ঈদগাঁও বাসস্টেশনসংলগ্ন কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং বাজারের প্রবেশমুখের ডিসি সড়কে অভিযান চালানো হয়। ফুটপাত দখল করে নির্মাণ করা ঝুপড়ি দোকান, অস্থায়ী স্থাপনা, সড়কের ওপর দেওয়া ছাউনি ও যত্রতত্র স্থাপিত সাইনবোর্ড সরিয়ে দেওয়া হয়।

এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই দোকানদারকে মোট ১৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং আরও একজনকে আটক করা হয়। কয়েকজনের মালামালও জব্দ করা হয়।

দ্বিতীয় দিনে অভিযানের পরিধি আরও বাড়ানো হয়। বাঁশঘাটা এলাকা থেকে শুরু করে ডিসি সড়ক, কাঁচাবাজার সড়ক, মাছবাজার সড়ক, কাপড় গলি সড়ক ও হাসপাতাল সড়কসহ বাজারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলিতে অভিযান চালানো হয়। স্কেভেটরের মাধ্যমে সড়ক ও ফুটপাতের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সকাল থেকে শুরু হওয়া অভিযান চলে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।

অভিযানে ঈদগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এটিএম সিফাতুল মাজদারের নেতৃত্বে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা ও সার্বিক সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল জাহান চৌধুরী এবং জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর তাজ জনি উপস্থিত থেকে অভিযানে সহযোগিতা করেন।

প্রশাসনের এমন বড় পরিসরের অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বাজারের ব্যবসায়ী, পথচারী ও স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়কের জায়গা দখল হয়ে থাকায় বাজারে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। দোকানের সামনে বাড়তি স্থাপনা, ছাউনি ও সাইনবোর্ডের কারণে সরু হয়ে গিয়েছিল চলাচলের পথ।

স্থানীয়দের মতে, সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থাকা ঈদগাঁও বাজারে দখল উচ্ছেদ নিয়ে বহুদিন ধরেই নানা অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে স্টেশন এলাকায় মহাসড়ক ও ফুটপাতের ওপর অবৈধ স্থাপনার কারণে পথচারীদের যানবাহনের পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছিল।

বর্তমান ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর দখল উচ্ছেদ ও যানজট নিরসনে আগেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাস আগে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোটিশ দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত শুরু হয় এই অভিযান।

এদিকে, প্রথম দিনের অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কিছু জায়গায় ফের দোকান বসানোর দৃশ্য দেখা যায়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো প্রশাসন কীভাবে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখবে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে স্থাপনা সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। উচ্ছেদ করা জায়গায় পুনরায় দোকান বসানো ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রকৃত নিম্নআয়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মংচিংনু মারমা জানিয়েছেন, ঈদগাঁও স্টেশন ও বাজারের অবৈধ দখল পুরোপুরি উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। পুনরায় কেউ সড়ক বা ফুটপাত দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুই দিনের এই অভিযানে দীর্ঘদিনের দখলের চিত্র বদলে গেলেও, দখলমুক্ত জায়গা কতটা স্থায়ীভাবে রক্ষা করা যায়—এখন সেটিই ঈদগাঁওবাসীর বড় প্রত্যাশা।