নাছির উদ্দিন সোহেল, মহেশখালী:

পরিবেশ, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শনিবার (৩০ মে) কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের মডেল হাইস্কুল হলরুমে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিইএইচআরডিএফ)-এর উদ্যোগে এক লোকাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

“একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, মর্যাদাসম্পন্ন, মানবিক ও টেকসই সমাজ বিনির্মাণ” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ সম্মেলনে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, ব্যাংকার, উন্নয়নকর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, তরুণ-তরুণী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সিইএইচআরডিএফ-এর প্রধান নির্বাহী মো. ইলিয়াছ মিয়া। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছোট মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াদ উদ্দিন শিকদার।

অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ও সিইএইচআরডিএফ-এর উপ-প্রধান সমন্বয়ক (এসওএস) রুহুল আমিন স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক নুরুল আবছার।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিইএইচআরডিএফ-এর অতিরিক্ত প্রধান পরিচালক (জিএইচকিউ) মোহাম্মদ খুবাইব এবং সহকারী মুখ্য সমন্বয়ক (ব্যবস্থাপনা) এমদাদুল হক।

সভাপতির বক্তব্যে মো. ইলিয়াছ মিয়া বলেন, বর্তমান বিশ্ব উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং লাগামহীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এর ফলে বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস, জলবায়ু সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেন, তরুণদের কেবল কর্মসংস্থানের প্রত্যাশী হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তন, পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজের নেতৃত্ব এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে চেয়ারম্যান রিয়াদ উদ্দিন শিকদার বলেন, স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতিতে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি উন্নত ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

স্বাগত বক্তব্যে রুহুল আমিন বলেন, মহেশখালী বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিভিন্ন বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্পের কারণে এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলেও স্থানীয় জনগণ ভূমি অধিগ্রহণ, জীবিকা সংকট, পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বৈষম্য এবং উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার পরিবর্তনের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি বলেন, উন্নয়নের সুফল যাতে স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে, সে জন্য জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতাভিত্তিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বারের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট কবির হোসেন, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর কর্মকর্তা মুহাম্মদ ওসমান সরওয়ার মিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর কক্সবাজার শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মাহবুব আলম, ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ছৈয়দুল করিম, তৈয়বিয়া মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ আজাদ, ব্যবসায়ী মুহাম্মদ সোহেল এবং সিপাহীপাড়া গণগ্রন্থাগারের উদ্যোক্তা সৌরভ আজাদ।

বক্তারা পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মানবাধিকার সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তারা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা, শিক্ষা বিস্তার এবং যুব নেতৃত্বের বিকাশের মাধ্যমে একটি সহনশীল ও টেকসই সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিইএইচআরডিএফ কক্সবাজার কলেজ সমন্বয়ক শাহপরান করিম, ছোট মহেশখালী ফোরামের প্রেস সেক্রেটারি ছৈয়দ আলমসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

সম্মেলনের শেষে একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও টেকসই সমাজ গঠনে তরুণদের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগই আগামী দিনের সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও বাসযোগ্য সমাজ নির্মাণের প্রধান চালিকাশক্তি।