পেকুয়া প্রতিনিধি
একসময় দুর্গম উপকূল মানেই ছিল দারিদ্র্য, অনগ্রসরতা ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত জনপদ। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের দুই উত্তরসূরি আলহাজ্ব এজেএম গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ও আলহাজ্ব সামশুউদ্দিন চৌধুরী।
প্রখ্যাত জমিদার মরহুম আহমদ কবির চৌধুরীর এই দুই সন্তান বাপ-দাদার সম্পদ ও প্রভাবকে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার বিস্তার ও মানবকল্যাণে ব্যয় করছেন। বাঁশখালী, পেকুয়ার রাজাখালীসহ উপকূলীয় জনপদে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে তারা শিক্ষার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভূমিকা রাখছেন।
রাজাখালী ফৈয়জুনেচ্ছা স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সুবিধা। আবেদন, প্রাথমিক নিশ্চায়ন ও ভর্তি ফি বাবদ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা সম্পূর্ণ মওকুফ করা হচ্ছে। মাত্র ১০০ টাকায় ভর্তি ফরম দেওয়া হয়। কলেজ শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ড্রেস এবং প্রতি মাসে খাতা-কলমও দেওয়া হয়।
উপকূলের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় পাঠদান শুরু হয়। বর্তমানে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি মিলিয়ে ১০৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১১ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারীর বেতন-ভাতাও ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বহন করছেন দুই ভাই। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন শিক্ষাবিদ মো. জসিম উদ্দিন।
রাজাখালী ফৈয়জুনেচ্ছা স্কুলের ইতিহাসও দীর্ঘ। মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে সাড়ে আট শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পাঠদানে রয়েছেন ১৫ জন শিক্ষক। এর আগে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফৈয়জুনেচ্ছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শুধু সাধারণ শিক্ষায় নয়, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারেও রয়েছে এই পরিবারের দীর্ঘদিনের অবদান। ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী বি. ইউ. আই. কামিল মাদ্রাসা। অধ্যক্ষ কপিল উদ্দিন ফারুকীর পরিচালনায় এখানে শত শত শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। চালু রয়েছে নুরানী ও হিফজ বিভাগও।
একসময় জমিদারদের পরিচয় ছিল সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিস্তৃত জমিজমার সঙ্গে। সেই প্রচলিত ধারণাকে বদলে গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ও সামশুউদ্দিন চৌধুরী পূর্বপুরুষের সম্পদকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও শিক্ষা উপকরণে সহায়তা এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তারা এই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, “কলেজ শাখায় রাজাখালী ও বাঁশখালীর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য সবকিছু ফ্রি। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও ওই ফান্ড থেকে দেওয়া হয়। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, এলাকার মানুষের বিপদে-আপদেও জমিদার পরিবারের দুই ভাই সবসময় সাড়া দেন।”
স্থানীয়দের মতে, যে অঞ্চলে একসময় শিক্ষার আলো পৌঁছানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছেন এই দুই ভাই। তাই তারা এখন শুধু জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি নন, উপকূলের শিক্ষার দুই আলোকবর্তিকা।
