পেকুয়া প্রতিনিধি:

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণের পর একদিনের বিরতি মিললেও আবারও শুরু হয়েছে তীব্র বৃষ্টিপাত। রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বর্ষণে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বন্যাকবলিত জনপদে। ইতোমধ্যে পেকুয়া পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। নতুন করে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় উঁচু এলাকাগুলোতেও পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

গত কয়েক দিনের বন্যায় শতাধিক বসতবাড়ি ধসে পড়েছে। ভেসে গেছে অসংখ্য মৎস্য প্রকল্প ও মাছের ঘের। তলিয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় এখনো নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।

বন্যার পানি শুধু ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতিই করেনি, কেড়ে নিয়েছে একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবনও। পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বলীরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মুশফিকুর রহিম (২১ মাস) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত শিশু প্রবাসী নাছিরের একমাত্র সন্তান বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের মতে, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নৌকাযোগে সীমিত পরিসরে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার অধিকাংশ পরিবার এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের ত্রাণ সহায়তা পায়নি। ফলে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও অনেক পরিবার নিজেদের ঘরে থাকা খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে পারছে না। কারণ অধিকাংশ বাড়ির রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বহু পরিবার শুকনো খাবার কিংবা প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মেহেরনামার বলীরপাড়া, মোরারপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও নন্দীরপাড়ার বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা। এছাড়া পৌরসভার জালিয়াখালী, মগকাটা, সিরাদিয়া, টেকপাড়া, বিলহাছুরা এবং মগনামা, উজানটিয়া, টইটং, রাজাখালী, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এখনো পানির সঙ্গে লড়াই করে বসবাস করছেন। এসব এলাকার বহু পরিবার এখনো কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বিভিন্ন স্লুইসগেটে পানি চলাচলে বাধার বিষয়টি উল্লেখ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বেশিরভাগ স্লুইসগেটে জাল বসিয়ে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। কয়েকটি স্লুইসগেটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সাংবাদিকরা উপস্থিত হয়ে জলকপাট খুলে দিয়ে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করলেও পরে আবার সেখানে জাল বসিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বন্যার পানি দ্রুত নামতে না পেরে দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে রয়েছে।

এদিকে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামায় ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কারকাজ শেষ না হতেই নতুন করে আরও কয়েকটি স্থানে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মেহেরনামার সেই ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, যা প্রায় প্রতিবছরই ভাঙনের কবলে পড়ে। বর্তমানে ওই অংশ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়া বেড়িবাঁধও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে বেড়িবাঁধটি ধসে পড়তে পারে। এমনটি হলে উজানটিয়া ও মগনামা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হবে এবং হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বেন।

রোববার সকাল থেকে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে নতুন করে উঁচু এলাকাগুলোতেও পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্মরণকালের মধ্যে এমন টানা ও অব্যাহত বৃষ্টিপাত কখনো দেখেননি বলে জানান বন্যাকবলিত পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়ার বাসিন্দা আসহাব উদ্দিন, বলীরপাড়ার সমশু মিয়া এবং স্থানীয় আরও কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, রোববার যেভাবে আবারও তীব্র বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে, এভাবে আর একদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পেকুয়াবাসীর জন্য আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।

তাদের দাবি, দুর্গত এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দাই এখনো নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। ফলে পানি আরও বেড়ে গেলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কিংবা উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান পেকুয়ার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে না থাকলেও তাঁর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কারকাজ তদারকি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দুর্ভোগে পড়া মানুষ দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, স্লুইসগেটগুলো উন্মুক্ত করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।