এম. মনছুর আলম, চকরিয়া :
বৈরী আবহাওয়া ও টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কয়েকটি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে দুইটি পৌরসভা ও ২৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শুক্রবার সকাল থেকে থেমে থেমে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। চকরিয়ার অভ্যন্তরীণ সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকায় বানভাসি মানুষ নৌকা, বাঁশের ভেলা, প্লাস্টিকের ড্রাম ও গাড়ির টায়ারের সাহায্যে পারাপার করছেন।
এদিকে, বর্ষণের মধ্যেই চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় নৌকাযোগে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১৩) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। নৌকাডুবির ওই ঘটনায় তার দুই বোনকে মুমূর্ষু অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চকরিয়া উপজেলার অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপকূলীয় বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
বানভাসি মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকার সড়কও পানির নিচে রয়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, ধানের বীজতলা, মাছের ঘের ও সবজিক্ষেত। বন্যার কারণে গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার গবাদিপশুসহ নিরাপদ স্থানে ও আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
উপকূলীয় বদরখালী, ডেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা ও সাহারবিল ইউনিয়নের অনেক পরিবার গবাদিপশুসহ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
বুধবার রাত ১টার পর থেকে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ওইদিন সকাল থেকেই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। শত শত নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে মাতামুহুরী নদীর ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে হু হু করে পানি ঢুকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, বরইতলী, হারবাং, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, পশ্চিম বড় ভেওলা, চিরিঙ্গা, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, ফাঁসিয়াখালী, কোনাখালী ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
বিশেষ করে পাহাড়ি ঢলের প্রবেশমুখ সুরাজপুর-মানিকপুর ও কাকারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও ৫ থেকে ৬ ফুট পানির নিচে রয়েছে। কাকারা-মানিকপুর সড়কের কয়েকটি অংশ দিয়ে মাতামুহুরী নদীর পানি প্রবাহিত হওয়ায় আশপাশের বসতঘর ডুবে গেছে।
বৃহস্পতিবার রাতের দিকে মাতামুহুরী নদীর পানি পৌরশহরের রক্ষাবাঁধ ও বিএমচর-চকরিয়া সড়ক উপচে পড়ে। এতে পৌরশহরের বিভিন্ন শপিং কমপ্লেক্সেও বন্যার পানি প্রবেশ করে। পানির প্রবল স্রোতে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল ভেসে গেছে। ব্যবসায়ীরা কয়েকশ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় বন্যাকবলিত এলাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর চকরিয়া পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ড সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কোচপাড়া ও কন্যারকুম এলাকার দুটি রক্ষাবাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয় বাসিন্দারা সারারাত চেষ্টা চালিয়ে বাঁধ দুটি রক্ষার কাজ করেন।
অন্যদিকে, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করছে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে চকরিয়া পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরণ করা হচ্ছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ইফতেখারুল আলম এবং উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আল আমিন বিশ্বাস।
