বৈরী আবহাওয়া ও টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ

ভারী বর্ষণে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি দুই শতাধিক পরিবার

প্রকাশ: ৭ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৫৫ , আপডেট: ৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:০১

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


এম. মনছুর আলম, চকরিয়া :

টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে দুই উপজেলার অন্তত ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

সোমবার ও মঙ্গলবার দিনভর থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিপাত এবং মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার নিচু এলাকা এবং গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি হেলে পড়েছে। কোথাও কোথাও ট্রান্সফরমারের ত্রুটির কারণে গত দুই দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে দুই উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশঙ্কা, এভাবে আরও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা টানা বৃষ্টিপাত চলতে থাকলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স কোম্পানি নির্মিত অপরিকল্পিত মাটির বাঁধের কারণে ফাঁসিয়াখালী ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের অন্তত সাতটি গ্রামের পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকায় পানি জমে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের উদ্যোগে ওই বাঁধ অপসারণ করে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করতেও দেখা গেছে।

অপরদিকে, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়বেষ্টিত এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের ঢাল, ঝুঁকিপূর্ণ টিলা, খাদ ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে মাইকিং করে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার সব স্লুইসগেট খুলে রাখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয়।

মঙ্গলবার বিকেলে মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা, ডেমুশিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা এবং উপকূলীয় পাঁচ ব্যান্ডের স্লুইসগেট পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার।

এ সময় তিনি জলাবদ্ধ এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দিলীপ দে, উপজেলা প্রকৌশলী আরিফ হোসেন, মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।

সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাইছার জানান, গত তিন দিনের টানা ভারী বর্ষণের কারণে সোমবার দুপুর থেকে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। পানির প্রবল স্রোতে তাঁর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। প্রধান সড়কের ওপর হাঁটুপানি থাকায় মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রাতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পুরো এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, তাঁর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, পহরচাঁদা, বিবিরখিল, হাফালিয়াকাটা ও মছনিয়াকাটাসহ বিভিন্ন গ্রামে ঢলের পানি প্রবেশ করেছে। দুপুর থেকে কয়েকটি নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। রাতের দিকে নদীর পানির প্রবাহ আরও বাড়লে নদীতীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, বৃষ্টিপাতের এ ধারা অব্যাহত থাকলে রাতের মধ্যেই বড় ধরনের বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেফাজতুর রহমান চৌধুরী টিপু বলেন, ভারী বর্ষণে উপকূলীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ নিচু এলাকা হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এতে উপজেলার চিংড়ি জোনের হাজার হাজার মৎস্যঘের পানিতে তলিয়ে গিয়ে ঘের মালিক ও চাষিদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ জানান, ইউনিয়নের নিচু এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে হাঁটুপানি ঢুকে পড়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অন্তত শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে প্রান্তিক কৃষকদের বিভিন্ন ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এভাবে টানা বৃষ্টিপাত চলতে থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীন দেলোয়ার বলেন, “সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে মাতামুহুরী নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। উপজেলার কোথাও নদীর পানির প্রভাবে কোনো বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, “উপকূলীয় এলাকার সব স্লুইসগেটের কপাট খোলা রাখা হয়েছে, যাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হতে পারে। পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।”