এম.মনছুর আলম, চকরিয়া :
সম্প্রতি সময়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় বিভিন্ন ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ৬জন সাবেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিকড়ের টানে ফিরে এসেছিল তাঁদের শৈশবের প্রিয় ক্যাম্পাস প্রাণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠে। তখন বিদ্যালয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। এসময় প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা (সদ্য বিসিএস ক্যাডার) পরীক্ষা চলমান থাকায় তাঁরা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার কক্ষ ঘুরে দেখেছিল। আর সেই মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব আবেগঘন পরিবেশ।
বলেছিলাম শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচ্য কক্সবাজার জেলার চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের কথা। ১৯৯০ সালে চকরিয়া পৌরশহরের প্রাণকেন্দ্রে পুরাতন বিমান বন্দর সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় সমাজ হিতৈষী বেশকিছু জ্ঞানী ব্যক্তিদের অক্লান্ত নিরলস পরিশ্রমের কারণে এতদ্বঞ্চলের হতদরিদ্র জনগোষ্টি ও গরীব মানুষের সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে সুদীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় এবং স্থানীয় ভাবে অভাবনীয় সাফল্যে অর্জনের মধ্যদিয়ে সুনামের সহিত এগিয়ে যাচ্ছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, বিগত তিন যুগ ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়টি। বর্তমানে বিদ্যালয়ের সাবেক অনেক শিক্ষার্থীরা এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বহি:বিশ্বেও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমের অবদান রেখে যাচ্ছেন। তারা এ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে নিজেকে খুবই গৌরববোধ করেন।
টানা কয়েক বছর ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন বেসরকারি বৃত্তি, পিইসি, জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে শ্রেষ্ট একটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের সাক্ষর রেখেছে।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন একজন শিক্ষার্থীর কাছে তার ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকে। শৈশবে পরিবারের গণ্ডির বাইরের প্রথম জগৎ বিদ্যালয়৷ বন্ধু, সহপাঠী, অগ্রজ, অনুজ, শিক্ষক, বিদ্যালয়ের আঙিনা ঘিরে থাকে নানা ধরনের মধুর স্মৃতি৷ সেই স্মৃতি গতকাল বৃহস্পতিবার রোমন্থন করলেন সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বিভিন্ন ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সাবেক ছয়জন মেধাবী শিক্ষার্থীরা।
ক্ষনিকের জন্য কিছুটা সময় হারিয়ে গেলেন তারা সেই সব দিনের ফেলা আসা দিনগুলোতে৷ সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষার্থীদের পদচারণায় বিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছিল মুখরিত।
সাফল্যের গৌরব মুকুট মাথায় নিয়ে অত্র প্রতিষ্ঠানের সাবেক ছয় শিক্ষার্থী তাদের শিকড়ের টানে প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে এসে প্রিয় শিক্ষকদের সাথে সাক্ষাত করেন। এসময় তারা শিক্ষকদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এবং পায়ে হাত দিয়ে আশীর্বাদ নেন। শিক্ষকেরাও তাদের প্রিয় ছাত্রদের গৌরবময় সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করেন। তাঁরা নিজেদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তুলে ধরেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদান এবং শৈশবের নানা ঘটনা।
বিদ্যালয় ক্যাম্পাস চত্বরে শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন মুহুর্তটি সৌন্দর্যময় আবহে যেন এক সেতু বন্ধন তৈরি করে মিলনমেলায়, যা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে চিত্র ধারণ করে রাখেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আখের ও সিনিয়র শিক্ষক (গনিত বিভাগ) এস এম নুরুন্নবী, রিদুয়ানুল হক এবং অন্যান্য শিক্ষকমণ্ডলীরা উপস্থিত থেকে সদ্য বিসিএস ক্যাডার হওয়া প্রাক্তন শিক্ষার্থীদেরকে অভিবাদন জানান। ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির সেবায় সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
বিসিএস সুপারিশপ্রাপ্ত ক্যাডাররা তাদের জীবন চলার পথে সাফল্যের পেছনে বিদ্যালয়ের অবদান এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনার কথাও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মেলবন্ধন দেখে বর্তমান শিক্ষার্থীর মাঝেও ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ৬জন বিসিএস ক্যাডার কোরক বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শিকড়ের টানে তাঁদের শৈশবের প্রিয় ক্যাম্পাসে গেলে–শিক্ষক শিক্ষিকাদের চোখে ফুটে ওঠে গর্ব, আনন্দ ও ভালোবাসার দীপ্তি। আর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠেন স্মৃতিকাতর। যেন মুহূর্তেই ফিরে যান তাঁদের ছাত্রজীবনের সেই দিনগুলোতে। কেউ বলছিলেন, “স্যার, এই তো সেই কক্ষ যেখানে বসে আমি পরীক্ষা দিয়েছিলাম।” আবার কেউ বললেন,”এই জায়গাতেই একদিন পরীক্ষার আগে দাঁড়িয়ে ছিলাম…” কথাগুলো বলতে বলতে তাঁদের চোখে মুখে ভেসে উঠছিল অতীতের অগণিত স্মৃতি।
একজন আবেগভরা কণ্ঠে বললেন,”স্যার, জীবনের অনেক স্মৃতি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়, কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দিনগুলোর স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।”
চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক নুরুল আখের বলেন- সত্যিই, নীড়হারা পাখি যখন আবার নিজের নীড়ে ফিরে আসে, তখন মা-পাখির হৃদয়ে কতটা আনন্দ জাগে, তা আমি জানি না। তবে আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যখন তাঁদের শিক্ষকদের দেখতে, তাঁদের শিকড়ের কাছে ফিরে আসে, তখন একজন শিক্ষকের হৃদয়ে যে অনুভূতির জন্ম হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। সেদিন উপলব্ধি করেছি—শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা এবং অসংখ্য মানুষের জীবনে স্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ। আজ আবারও মনে হলো—শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে আমি ভুল করিনি। বরং এটাই আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
