জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:
সরকারের ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উদ্যোগে চলতি মৌসুমে টেকনাফ ও উখিয়ার বনাঞ্চলে ২৭ লাখ ৫৬ হাজার ১০০টি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কক্সবাজার দক্ষিণের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রায় ১ হাজার ১০৩ হেক্টর বনভূমিতে এ বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে কক্সবাজারের বন, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটে ২০ হেক্টরে ৫০ হাজার, হ্নীলা বিটে ৬০ হেক্টরে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং মধ্য হ্নীলা বিটে ১০০ হেক্টরে ২ লাখ ৫০ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। শীলখালী রেঞ্জের শীলখালী সদর বিটে ৪০ হেক্টরে ১ লাখ এবং মাথাভাঙ্গা বিটে আরও ৪০ হেক্টরে ১ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে।
এছাড়া হোয়াইক্যং রেঞ্জের হোয়াইক্যং বিটে ১৯০ হেক্টরে ৪ লাখ ৭৫ হাজার এবং মনখালী বিটে ৩০ হেক্টরে ৭৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উখিয়া রেঞ্জের থাইংখালী বিটে ১৫০ হেক্টরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার, দোছড়ি বিটে ৫০ হেক্টরে ১ লাখ ২৫ হাজার এবং মধুরছড়া বিটে ৬০ হেক্টরে ১ লাখ ৫০ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। রাজারকুল রেঞ্জের পাগলিরবিল বিটে ৫০ হেক্টরে ১ লাখ ২৫ হাজার এবং ইনানী রেঞ্জের রাজাপালং, জালিয়াপালং ও ইনানী সদর বিটে প্রতিটিতে ৫০ হেক্টর করে ১ লাখ ২৫ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। চোয়াংখালী বিটে ৯০ হেক্টরে ২ লাখ ২৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া উপকূলীয় বন বিভাগ, চট্টগ্রামের আওতায় টেকনাফের হ্নীলা বিটের জাদীমুড়া থেকে চৌধুরীপাড়া পর্যন্ত বাঁধ বনায়নে ১ লাখ এবং চৌধুরীপাড়া এলাকায় আরও ১ লাখ ১১ হাজার ১০০টি ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা রোপণের কাজ চলমান রয়েছে।
বন বিভাগ জানায়, অর্জুন, হরীতকী, বহেড়া, চিকরাশি, জারুল, গর্জন, পলাশ, বকুল, কড়ই, সেগুন, গামারি, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, কাঞ্চন, শিমুল, কাঠবাদাম, আমলকী, জলপাই, কালোজাম, পুঁটিজামসহ মোট ৫৬ প্রজাতির দেশীয় বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এসব দীর্ঘমেয়াদি বনায়ন ভবিষ্যতে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় পাহাড় থেকে কাঠ ও জ্বালানি সংগ্রহ ছিল সাধারণ বিষয়। বর্তমানে গ্যাস ও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় কাঠের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর পাহাড়ি বনাঞ্চলে ডাকাতি, অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পাহাড়ে যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি কাঠুরিয়া ও পাহাড়সংলগ্ন কৃষকরাও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বনাঞ্চলে যেতে সাহস পান না।
পরিবেশবিদদের মতে, মানুষের অনুপ্রবেশ কমে যাওয়ায় নতুন সৃজিত বনাঞ্চল সংরক্ষণের সম্ভাবনা বেড়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছগুলো দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অক্সিজেন উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনিক চৌধুরী বলেন, সরকারের ঘোষিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বন বিভাগের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগেও চলতি মৌসুমে ১০ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব গাছ ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অক্সিজেন সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বনাঞ্চল ও স্থানীয়ভাবে রোপণ করা গাছ সংরক্ষণে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ১ হাজার ১০৩ হেক্টর বনভূমিতে সাড়ে ২৭ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এসব বাগানে বনজ, ফলজ ও ঔষধিসহ ৫৬ প্রজাতির গাছ রয়েছে। তিনি বলেন, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বন বিভাগ এসব বনায়ন সংরক্ষণ করবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে বন, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘমেয়াদে এসব বনায়ন পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
