পেকুয়া প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের গলাছিরা তিনমোয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে সড়ক নির্মাণ, বালু উত্তোলন এবং মূল্যবান বনজ গাছ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আনিস সওদাগর, রহিমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের পর বন বিভাগ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে প্রায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ পাহাড় কেটে একটি কাঁচা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সড়ক ব্যবহার করে ভারী যন্ত্রপাতি বনের গভীরে নিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং মূল্যবান বনজ গাছ পাচার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের মাঝখানে পাহাড় কেটে প্রশস্ত একটি কাঁচা সড়ক তৈরি করা হয়েছে। সড়কের দুই পাশে কাটা পাহাড়ের ঢাল স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বনাঞ্চলের ভেতরে আরও কয়েকটি স্থানে বালু উত্তোলনের জন্য যন্ত্রপাতি বসিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দেলোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, টৈটং বিট কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব মুবিনকে ম্যানেজ করেই একটি সিন্ডিকেট বালু উত্তোলন ও বনজ গাছ পাচারের মতো কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর পেকুয়া উপজেলা সমন্বয়ক ও পরিবেশকর্মী দেলওয়ার হোসাইন বলেন, “সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ এবং সেই সুযোগে বালু উত্তোলন ও বনজ সম্পদ পাচার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। দ্রুত এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার, নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি এবং বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় পেকুয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।”

পরিবেশবিদদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, বালু উত্তোলন এবং বনজ সম্পদ পাচারের ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে, বন উজাড় হচ্ছে এবং পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, “টৈটংয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তদন্ত শুরু করেছেন। এ জন্য একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সরেজমিনে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে টৈটং বিট কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব মুবিন বলেন, “পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ কিংবা তদন্তের বিষয়টি আমার জানা নেই।”

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে চলমান সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে বন বিভাগ ও প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে টৈটংয়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এর জীববৈচিত্র্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।