পেকুয়া প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের হারুণ মাতবরপাড়া এলাকায় পুত্রবধূকে রক্ষায় এগিয়ে এসে আবু তাহের (৭৫) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার (২৬ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত আবু তাহের একই এলাকার মৃত আবদু ছত্তরের ছেলে।

পরিবারের অভিযোগ, একই এলাকার নুরুল হোসেনের ছেলে শিফাত, শাহ আলমের ছেলে বাহাদুরসহ কয়েকজন সংঘবদ্ধভাবে এ হামলা চালায়। তাদের দাবি, প্রবাসী ছেলে কাইছারের স্ত্রী তৈয়বা বেগমের বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে তার চিৎকার শুনে আবু তাহের ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় হামলাকারীরা তার হাতে থাকা দা কেড়ে নিয়ে তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে এবং পরে বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দেয়।

পরিবারের সদস্যরা চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুকুর থেকে আবু তাহেরকে উদ্ধার করে দ্রুত পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের নাতনি তাসফিয়া বলেন, “আমার দাদুকে প্রথমে হাতে কোপ দেওয়া হয়। এরপর তাকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। আমরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান, তিনি আর বেঁচে নেই।”

নিহতের পুত্রবধূ ছকিনা বেগম বলেন, “আমার জা তৈয়বা বেগমের চিৎকার শুনে শ্বশুর ঘটনাস্থলে যান। সেখানে শিফাত, বাহাদুরসহ কয়েকজন তাকে এলোপাতাড়ি মারধর ও কুপিয়ে আহত করে পুকুরে ফেলে দেয়।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিহতের প্রবাসী ছেলে কাইছারের স্ত্রী তৈয়বা বেগমের সঙ্গে অভিযুক্ত শিফাতের একসময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বলে এলাকায় আলোচনা ছিল। কয়েক মাস আগে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিবারের দাবি, এরপর তৈয়বা বেগম ওই সম্পর্ক থেকে সরে আসেন।

পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর থেকেই শিফাত বিভিন্ন সময় রাতে বাড়ির সামনে গিয়ে ঢিল ছোড়া, অশ্লীল মন্তব্য করা এবং উত্ত্যক্ত করে আসছিল। ঘটনার রাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পরিবারের দাবি, ঘটনার রাতে শিফাত, বাহাদুরসহ কয়েকজন বাড়ির সামনে এসে ঢিল ছোড়ে এবং অশ্লীল ভাষায় ডাকাডাকি করে। দরজা না খোলায় তারা জোরপূর্বক বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় তৈয়বা বেগম চিৎকার শুরু করলে আবু তাহের তাকে রক্ষায় এগিয়ে যান। তখনই তার ওপর হামলা চালানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, শিফাত ও বাহাদুরের নেতৃত্বে একটি বখাটে চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। বিশেষ করে প্রবাসীদের পরিবারের নারীদের উত্ত্যক্ত করা, প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা এবং প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুছ চৌধুরী বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। গ্রাম পুলিশ নিয়ে জড়িতদের খোঁজার চেষ্টা করেছি। ভুক্তভোগী পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

ঘটনার পর পুলিশের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, রাতে এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন বা আসামিদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো অভিযান চালায়নি। শুধু হাসপাতাল থেকে মরদেহ থানায় নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে পেকুয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। একের পর এক খুন, হামলা ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদি হাসান বলেন, “আবু তাহের নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।”