এম. মনছুর আলম, চকরিয়া :
কক্সবাজারের চকরিয়ায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় চলতি মৌসুমে কন্দজাত ফসল হিসেবে কচু চাষে সফলতার মুখ দেখেছেন বহু প্রান্তিক কৃষক। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি অধিক লাভের আশায় এবার কচু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। প্রতি বছরই বিভিন্ন এলাকায় কচু চাষের পরিধি বাড়ছে এবং সাধারণ কৃষকদের মধ্যেও এ চাষে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তুলনামূলক কম ঝুঁকি ও কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় গরিবের সবজি হিসেবে পরিচিত মুখিকচু ও লতিরাজ জাতের কচু চাষ করে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।
কচু চাষ এখন আর শুধু পারিবারিক চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাণিজ্যিক কৃষির একটি লাভজনক মডেলে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় কৃষকরা নিয়মিত আয় করতে পারছেন, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩৩ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কচু চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ১৫ টন লতি উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য টনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। স্থানীয়ভাবে ‘লতিরাজ’ নামে পরিচিত এ জাতের কচু বর্তমানে জনপ্রিয় সবজিতে পরিণত হয়েছে। উপযুক্ত ভূমি, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতায় এ বছর কচুর উৎপাদনও ভালো হয়েছে।
ধান চাষের তুলনায় অন্তত পাঁচ গুণ বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা দিন দিন কচু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কচু চাষে খুব কম পরিচর্যা প্রয়োজন হয়। ফলে ঝুঁকিও কম। ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে কম।
কৃষকদের ভাষ্য, কচু গাছের প্রায় সব অংশই ব্যবহারযোগ্য। কচুর পাতা, ডাঁটা ও লতি সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। পাশাপাশি কচুর মূল ও চারা বিক্রি করেও বাড়তি আয় করা সম্ভব। একজন কৃষক ৪০ শতক জমিতে কচুর আবাদ করে মৌসুমে অনায়াসে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে কচু ও কচুর লতি প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে অন্যান্য সবজির তুলনায় এর চাহিদাও বাড়ছে। এ ফসলে কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। গরু-ছাগল কচু খায় না এবং বাড়তি শ্রমিক নিয়োগেরও প্রয়োজন পড়ে না। কৃষকরা মুখিকচু রোপণের প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যেই লতি বিক্রি শুরু করতে পারেন। প্রতি কানি জমি থেকে ৮০ থেকে ৯০ মণ পর্যন্ত কচু উৎপাদন হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, সাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, কৈয়ারবিল, কাকারা, হারবাং, বরইতলী ইউনিয়ন এবং পৌরসভা এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কচুর আবাদ হয়েছে। যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে সবুজ কচু গাছের সমারোহ।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হাঁসেরদীঘি এলাকার কৃষক মো. করিম বলেন, “জীবনে এই প্রথম লতিরাজ কচুর আবাদ করেছি। শুরুতে কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম। ৪০ শতক জমিতে কচু লাগিয়েছি। বাজারদর ও ফলন নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এখন আমি খুবই সন্তুষ্ট। প্রতিদিন লতি সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে ভালো দামে বিক্রি করছি। শুরু থেকে কৃষি অফিস আমাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়েছে।”
চকরিয়া পৌরসভার সালাম মাস্টারপাড়া এলাকার কৃষক আহমদ নবী বলেন, “চলতি মৌসুমে ৮০ শতক জমিতে লতিরাজ কচুর আবাদ করেছি। কম খরচ ও কম ঝামেলায় অন্য যেকোনো ফসলের তুলনায় বেশি লাভ হয়েছে। তাই আগামীতে আরও বেশি জমিতে কচু চাষ করব।”
চকরিয়া পৌরশহরের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, “গত সপ্তাহে কচুর লতি ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। বর্তমানে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারদর ওঠানামা করলেও কচু চাষিরা সাধারণত লোকসানের মুখে পড়েন না।”
চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুর ইসলাম বলেন, “প্রান্তিক ও উদ্যমী কৃষকদের আমরা সবসময় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকি। কচুর চাহিদা ও বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এ ফসলের আবাদ বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “লতি কচু চাষ লাভজনক এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ। কৃষকরা সঠিক পরামর্শ অনুসরণ করলে অল্প সময়েই ভালো ফলন পেতে পারেন। কচু চাষের এই সাফল্য অন্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করবে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, “অধিক লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে উপজেলার প্রান্তিক কৃষকরা কচু চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগ আগ্রহী কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল জাতের চারা সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করছে। কৃষকরা এখন কচুকে একটি অর্থকরী সবজি ফসল হিসেবে বিবেচনা করছেন। সঠিক পরিচর্যা করলে চার থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত নিয়মিত ফলন পাওয়া যায়।”
