আজাদ মনসুর:
এটি কোনও রূপকথার গল্প নয়, না কোনও মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র; যেখানে একজন সোনিয়া মুখ্য চরিত্র। আসলে সন্তানদের ভালো ও খারাপসহ জীবনের সমস্ত দিক নিয়ে কোন পিতা-মাতার কাছে উত্তর থাকে না। এই উপলব্ধি কিছুটা বিভ্রান্তিকর মনে হলেও কোন কোন সময়ের জন্য এটি কঠিন সত্য বলা যায়। শৈশব থেকেই প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতা বুকভরা ভালবাসা ও শাসনের মধ্যে রাখার পাশাপাশি একটি বিষয়ে ধারণ করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। স্কুল জীবন থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কঠিন এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সেই শুরু, পিতা-মাতার এই কঠিন বাস্তবকে যারা মূল্য দিয়েছে তাদেরকে আর ঠেকায় কে? অভিভাবকদের এই দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি যে কোন পোষ্যদের প্রচেষ্টার জন্য বড়ই অন্তরায় বলা যায়।
বিষয়টি এভাবে শুরু করার কারণ হলো ঈশিতা জিন্নাত সোনিয়া মূলত সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। তিনি সদা পরিবারের কঠিন বাস্তবতাকে ইবাদত হিসেবে নিয়ে সামাজিক, আর্থিকসহ নানা প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে জাগিয়েছে নিজেকে। এতে করে জাগানোর সুযোগ পেয়েছে অন্যকেও। বলছিলাম কক্সবাজারের একজন অদম্য মেধাবী নারীর ৪৬তম বিসিএস ক্যাডার হওয়ার গল্পগাঁথা। যে কিনা সমাজের তথাকথিত নানা কটুবাক্যকে উপেক্ষা করে সংগ্রাম করে গেছেন অনবরত।
বিসিএস যাত্রার বিভিন্ন বিষয়ে সোনিয়া এভাবে বলেছেন, স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নভঙ্গে হতাশার দোলাচলে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা বিষয়ে তিনি বলেন, বিসিএস বাংলাদেশের অন্যতম কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, যা পাস করা সবার জন্য সহজ নয়। এটি মূলত একটি মাইন্ড গেম, যেখানে সিলেবাস বিশ্লেষণ, প্রশ্নের ধরণ, বোঝা এবং বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণের মতো ধাপে ধাপে কৌশলগত প্রস্তুতি প্রয়োজন। সঠিক গাইডলাইন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষায় সফল হওয়া সম্ভব। আল্লাহর ওপর পূরণ আস্থা ও ভরসা রেখে বিসিএস এর মত কঠিন স্বপ্নযাত্রায় শত বাঁধা পেরিয়ে কিভাবে প্রশাসন ক্যাডার হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন সে কথাও তিনি পরতে পরতে তুলে ধরেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, অহরহ বাঁধা ছিল, চিরায়ত পুরুষ শাসিত এই সমাজে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা আমাদের সময়ে অনেকটা দুরূহ ছিল। এত পড়ালেখা করে কি হবে?”মেয়েদের এত পড়ে লাভ কি? “বিয়ের পর আবার পড়ালেখা হয় নাকি? এইরকম হাজারো কাঁটাযুক্ত শব্দ ছুড়ে মেরেছেন অনেকেই। আমার বিশ্বাস ছিল সফলতা একদিন কথা বলবে। ইস্পাতসম বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ সৎ ও পরিশ্রমী মানুষকে কখনো ফেরান না।
পরিশ্রম সফলতার মূল চাবিকাঠি—এই প্রবাদটি চিরন্তন সত্য। কারণ জীবন, কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাজীবনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত প্রচেষ্টা, আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য ধরে কাজ করলে যে কোনো কঠিন কাজ সহজ হয়, যা মানুষকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে নিয়ে যায়। পরিশ্রম ছাড়া শুধু মেধা দিয়ে সফলতা অর্জন অসম্ভব। যা সোনিয়াকে মূল্যায়ন করলেই বুঝা যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পড়াশোনার সম্পূর্ণ ফোকাসটি ছিল প্রশাসন ক্যাডার ভিত্তিক। বিশেষ করে প্রিলির সময় গড়ে ১২ ঘন্টা পড়েছি। তবে ১০ ঘন্টার কম নয়। প্রিলিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর রিটেনে ১৪ ঘন্টা থেকে ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত পড়ার টেবিলে থাকতে হয়েছে। পরীক্ষার সময় ২ ঘন্টা চোখে ঘুম দেয়া হয়েছে। আরেকটা বিষয়— কোচিং নিয়ে নানা জনের নানা ধারণা থাকে। তবে কোচিং জরুরি না, পড়ার টেবিলে সময় বেশি দেওয়া জরুরি। কিন্তু নিজের অবস্থান কেমন, প্রতিযোগীদের মধ্যে নিজের অবস্থান ঠিক আছে কি না, পড়ার আর লিখার স্ট্যাটেজি চেঞ্জ করতে হবে কি না, নিজের স্ট্রং জোন, উইক জোন কোনগুলো, কোন সাবজেক্টে বেশি সময় দিতে হবে এসব বিষয় কোচিংএ পরীক্ষা দিলে বুঝা যায়। সুতরাং যাদের সামর্থ্য আছে কোচিং করতে পারলে এগিয়ে থাকবে। আর না করলে ক্যাডার হতে পারবেন না এটি ঠিক নয়। অনেক বিসিএস ক্যাডার আছে যারা কখনো কোচিং-এ যায়নি।
বিসিএসকে গুরুত্ব দেওয়ার পেছনের কারণ সংক্রান্ত একটি প্রশ্নে এভাবেই শুরু করেন মেধাবি এই প্রশাসন ক্যাডার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক নিয়োগে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পরেও নানা প্রতিকূলতা, ব্যক্তিগত সংকট বা প্রশাসনিক জটিলতায় ছিটকে পড়ার গল্পগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যা আমার বেলায়ও হয়েছে। অনেকের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ প্রতীক্ষা, রাজনীতির শিকার, অথবা মানসিক অসুস্থতার কারণে নিজেদের স্বপ্ন থেকে দূরে সরে যান, যা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২২ সালে জার্নি শুরু করে, যখন ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক নিয়োগের থেকে দুর্ভাগ্য বসত ছিটকে পড়ি তখন প্রথমে স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে চলে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু আমার একাডেমিক রেজাল্ট ভালো, ফার্স্ট ছিলাম। কিন্তু গ্রাম, দেশ ও আপনজন ছেড়ে প্রবাসে বা বাইরে যাওয়া সত্যিই অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও আবেগের বিষয়। পরিবারের ভালো থাকা এবং উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, যা প্রবাসীদের জন্য অনেক সময় দুঃখ ও ত্যাগের কারণ হয়। এই বিচ্ছিন্নতা ও শেকড় ছেড়ে যাওয়ার বেদনা মানুষের জীবনে এক গভীর অনুভূতি, যা তাদের পরিবার, গ্রাম ও দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই দেশের মধ্যেই কিছু করার চেষ্টা করেছি।
জানি, প্রতি বছর প্রায় চার লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ শতাংশের কম ক্যাডার হওয়ার যে অকল্পনীয় কঠিন বাস্তবতা, তা মেনে নিয়ে মানসিক দৃঢ়তা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সাথে প্রস্তুতি নেওয়াই সামনে যাওয়ার একমাত্র পথ। এ তীব্র প্রতিযোগিতায় সফল হতে দীর্ঘমেয়াদী অধ্যবসায়, সঠিক কৌশল, এবং প্রিলি-লিখিত-ভাইভা—প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা প্রস্তুতি অপরিহার্য। অসম্ভবকে সম্ভব করার ব্রত নিয়ে সেদিন একটা সিটের আশায় বুকে সাহস সঞ্চয় করি।
বলার ভাষা নেই মা, বাবা, ভাই-বোন, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আমার শিক্ষকগণ সবার বিশ্বাস ছিল, যা আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বিশেষ করে একজন সোনিয়া করার নৈপথ্যের কারিগর আমার বড় বোন আফসানা জাহান খুকি। পড়ালেখায় বড়বোনের ত্যাগ ও কষ্ট অপরিসীম, যা পরিবারের ভিত্তি গড়ে দেয়। তাছাড়া জীবনসঙ্গী মোহাম্মদ আজিজ এর কথা বলতে হবে। তিনি জাতিসংঘের একটি সংস্থায় চাকরি করার পাশাপাশি এগ্রিকালচার প্রজেক্টের একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সমধিক পরিচিত। সংসারের সকল কাজ সামলিয়ে স্ত্রীকে এ যাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন না দিলে এত কঠিন পথ পাড়ি দেয়া মোটেও সহজ ছিল না। কৃতজ্ঞতা সবার প্রতি।
নতুনদের উদ্দ্যেশে সোনিয়া যে বার্তা দিয়েছেন আর তা হলো, বিসিএস প্রস্তুতির আগে প্রথমে নিজের নৈতিকতার ভিত্তি স্ট্রং করতে হবে। কারণ বিসিএস দিয়ে আপনারা প্রজাতন্ত্রের প্রথম শ্রেণীর চাকরি করবেন। এটা শুধু চাকরি নয়, দেশ সেবার অন্যতম মাধ্যম। তারপর প্রথমে আপনাকে মানসিকভাবে স্ট্রং হতে হবে, প্রচুর পড়তে হবে, খাটতে হবে এটা মাথায় নিয়ে শুরু করতে হবে। বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, গণিত, বিজ্ঞান, কম্পিউটারসহ সব বিষয়ে নিজেকে সমান পারদর্শী হতে হবে। নিয়মিত পত্রিকা পড়তে হবে, সমসাময়িক বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে। রুটিন করে পড়তে হবে। উইক জোনে বেশি সময় দিয়ে স্ট্রং করে নিতে হবে। আর এর মধ্যে কোনো সাবজেক্টকে স্ট্রং জোন মনে করে অবহেলা করা যাবে না। রিটেনে খাতার প্রেজেন্টেশন ম্যাটার করে বেশি। সব মিলিয়ে অনেক দীর্ঘ আর কঠিন একটা যাত্রা মাথায় নিয়েই শুরু করতে হবে। মাঝপথে ফ্যামিলিগত, ব্যক্তিগত, আর্থিক নানা ধরনের বাধা আসবে, ভেঙে পড়বেন; খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ভেঙে পড়া যাবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় আল্লাহর রহমত ও মানুষের দোয়া। সবার সাথে ভালো আচরণ করবেন। নিয়মিত নামাজ পড়ে আপনার সৃষ্টিকর্তাকে প্রার্থনায় ডাকবেন।
সর্বোপরি প্রায় অনেক প্রশাসন ক্যাডার নিজেকে বিসিএস ক্যাডারদের মধ্যে কথিত দাম্ভিকতার মনোভাব দেখায়, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হওয়ার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার দাপট তৈরি হয়। নতুন প্রশাসন ক্যাডার হয়ে বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখবেন। এ ধরণের একটি প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজারের মেয়ে ঈশিতা জিন্নাত সোনিয়া এভাবে বলেন, প্রশাসন ক্যাডার হয়ে আমরা যদি নিজেদের মধ্যে দেশ ও জনগণের সেবা করার মানসপট তৈরি করতে না পারি তাহলে সরকারি চাকরি করার যোগ্যতা রাখি না।
তবে ক্ষমতার প্রয়োগ হোক আমিও চাই। তবে তা যেনো শুধুমাত্র জণকল্যাণকর হয়, নৈতিকতা বিবর্জিত নিজের চাহিদা পূরণে নয়। আমরা তরুণরা যদি দুর্নীতিমুক্ত জনকল্যাণমুখী প্রশাসনের স্বপ্নকে লালন করি, তবেই ক্ষমতার দাপটের পরিবর্তন আসবে। দোয়া করবেন, এ যজ্ঞ আমি দিয়ে শুরু করতে চাই। এরকম প্রতিটা আমি মিলে একদিন আমরা হবো ইনশাআল্লাহ।
লেখক: গবেষক, সাংবাদিক, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় এমফিল গবেষক।
