মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :
কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ার অভিযোগে মা–মেয়েকে হেনস্তা করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)কে তলব করেছেন কক্সবাজারের জাস্টিস অব দ্য পিস ও চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম।
বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে গত ৮ মার্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন তিনি।
আদালতের আদেশে বলা হয়, “ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় এসআই কর্তৃক মা–মেয়েকে মারধর, এক মাসের কারাদণ্ড” শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ৪ মার্চ পেকুয়া থানায় রেহেনা মোস্তফা রানু ও জুবাইদা বেগম নামের দুই নারীকে আটক করে থানায় মারধর করা হয়। পরে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড দেন।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত নারীরা যদি থানায় এসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা, গালিগালাজ বা হামলার মতো অপরাধ করে থাকে, তবে সরকারি কর্মচারীর কর্তব্য পালনে বাধা বা সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলার অভিযোগে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় মামলা রুজু করা যেত। একই সঙ্গে ১৫৭ ধারার বিধান অনুযায়ী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়ে আইনানুগ তদন্ত শুরু করার সুযোগ ছিল। প্রয়োজন হলে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে উপস্থাপনের বিধানও রয়েছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে সংঘটিত অপরাধে দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। আগে থেকে গ্রেপ্তারকৃত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা কাউকে মোবাইল কোর্টে উপস্থাপনের সুযোগ আইনে নেই—এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে।
তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আলোচিত ঘটনাটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে সংঘটিত হয়নি এবং অভিযুক্ত দুই নারীকে থানায় আটক করার পর মোবাইল কোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এতে থানার অফিসার ইনচার্জ আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আটক অবস্থায় ওই দুই নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারার ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জের কাছে ব্যাখ্যা তলব করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আদালত জানান।
এ প্রেক্ষিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা, থানায় রুজুকৃত জিডি বা মামলা, তাদের আটক করার কারণ এবং কী প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে—এসব বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে পেকুয়া থানার ওসিকে আগামী ১৬ মার্চ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজারের আলোচিত এ ঘটনায় জাস্টিস অব দ্য পিসের এ আদেশকে সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান বলেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী হবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু ক্ষেত্রে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে এটি সহায়ক হবে।
দৈনিক সৈকতের সম্পাদক ও কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ ধরনের আদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে একটি সমৃদ্ধ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আ.ন.ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। জাস্টিস অব দ্য পিসের এ পদক্ষেপ এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা বন্ধে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
