জালাল আহমদ, কক্সবাজার থেকে ফিরে:
“বিএনপি সরকার গঠন করলেই অতীতের ন্যায় ব্যাপক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে এবং গত দেড় বছরে দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা সংঘটিত অপকর্মের বিচার করা হবে”— সালাহউদ্দিন আহমদ-এর এমন আশ্বাসে পাল্টে গেছে কক্সবাজারের চারটি আসনের ভোটের ফলাফল। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ক্যারিশমায় জেলার সবকটি আসনেই বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে।
ভোটের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সাধারণ মানুষ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিমত পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাছাড়া এবারের সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার জেলায় দুইজন আলোচিত জাতীয় নেতা নির্বাচন করায় দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর থেকেই কক্সবাজার জেলা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে আওয়ামী লীগবিহীন এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত পৃথকভাবে নির্বাচন করায় ভোটের অঙ্কে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছিল প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি আসনের মধ্যে বিএনপি ১টি, জামায়াত ১টি, আওয়ামী লীগ ১টি এবং আওয়ামী জোট (বাকশাল) ১টি আসন লাভ করে। সে সময় সরকার গঠন করে বিএনপি। বিএনপির পাঁচ বছরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি ৩টি এবং আওয়ামী লীগ ১টি আসনে জয়ী হয়, যদিও সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট চারটি আসনেই জয়লাভ করে। ১/১১-পরবর্তী সরকারের কঠোর দমননীতির মধ্যেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জেলার চারটির মধ্যে ৩টি আসন পায় বিএনপি-জামায়াত জোট।
পরবর্তী নির্বাচনগুলো ছিল একতরফা এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-নিয়ন্ত্রিত। ভোটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অনিয়ম, প্রতারণা ও ভোট ডাকাতির আশ্রয় না নিলে জেলার চারটি আসনেই বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীরা জয়ী হতেন—এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এবার দুই দল পৃথকভাবে নির্বাচন করায় শুরুতে জেলার চারটি আসনে বিএনপির আধিপত্য থাকলেও আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও হেফাজতে ইসলামের কিছু নেতাকর্মী বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালানোয় সমীকরণ কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দুইবার জেলায় সফর করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এবং সাবেক মন্ত্রী কর্নেল অলি আহমদসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারাও কক্সবাজারে প্রচারণা চালান।
বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কক্সবাজার সফর বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তবে তার পরিবর্তে সালাহউদ্দিন আহমদ নিজ এলাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে জেলার বাকি তিনটি আসনেও ব্যাপক গণসংযোগ ও প্রচারণা চালান। এতে বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়।
কক্সবাজার-১ ও ২ আসনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। তবে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সালাহউদ্দিন আহমদের কৌশলী হস্তক্ষেপে টেকনাফের বিদ্রোহী নেতা আবদুল্লাহকে বুঝিয়ে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষে নামানো হয়, যা ভোটের সমীকরণ পাল্টে দেয়।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে তীব্র গ্রুপিং ও বিভাজন ছিল। সালাহউদ্দিন আহমদ সবাইকে এক টেবিলে বসিয়ে ঐক্যের বার্তা দেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে এক মঞ্চে বক্তব্য দেন। এরপর থেকেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে বলে নেতাকর্মীরা মনে করেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আ. মান্নান আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ফলাফলে দেখা যায়, জেলার চারটি আসনেই বিএনপি জয়ী হয়েছে।
চতুর্থবারের মতো রেকর্ড ভোটে সালাহউদ্দিনের প্রত্যাবর্তন
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে সালাহউদ্দিন আহমদ ধানের শীষ প্রতীকে ২,২২,০১৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুখ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ১,২৯,৭২৮ ভোট। প্রায় ৯৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে এই জয় তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোট ভোটের হার ছিল ৬৭.০৬ শতাংশ।
মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় বিএনপির চমক
কক্সবাজার-২ আসনে বিএনপির আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ১,২৫,৫৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ পান ৯১,৮৮৯ ভোট। ভোটের হার ছিল ৬০ শতাংশ।
সদরে বিএনপির আধিপত্য
কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনে বিএনপির লুৎফুর রহমান কাজল ১,৮২,০৯৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শহীদুল আলম বাহাদুর পান ১,৬১,৮২৭ ভোট।
কক্সবাজার-৪ এ শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী ১,২৩,৫৮২ ভোট পেয়ে পঞ্চমবারের মতো জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নুর আহমদ আনওয়ারী পান ১,২২,০৩৩ ভোট। মাত্র দেড় হাজার ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয় জয়-পরাজয়।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের বাসিন্দা ব্যারিস্টার সাফফাত চৌধুরী বলেন, “সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে অতীতের উন্নয়ন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কারণে তিনি জেলার মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর সক্রিয় প্রচারণায় গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।”
জেলা বিএনপির সাবেক ছাত্রনেতা ইউসুফ বদরী বলেন, “জাতীয় নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের মেধাবী নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক ভিত্তির কারণেই চারটি আসনে বিজয় নিশ্চিত হয়েছে।”
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এটিএম আমিরুল গণি খোকন বলেন, “চকরিয়া-পেকুয়ায় দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় সাধারণ মানুষ সালাহউদ্দিন আহমদের প্রতি আস্থা রেখেছেন। তাঁর সক্রিয় ভূমিকাই জেলার চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
